May 13, 2021

এইমাত্র পাওয়া সংবাদ

তিনটি ঘটনা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয়। মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম।

Untitled-3copy

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে আগেই আঁচ করেছিলাম। তাই ২৪ মার্চেই আমরা চট্টগ্রাম সীমান্ত এলাকার সব অবাঙালি সেনা সদস্য ও অফিসারদের বন্দী করে সীমান্ত দখল করি। পরিকল্পনাটা আমি আগেই করে রেখেছিলাম। ২৫ তারিখ তারা আক্রমণ করার আগেই আক্রমণ করে চট্টগ্রাম শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেই এবং ২৬ তারিখে কুমিল্লায় সফল অ্যামবুশ করে চট্টগ্রাম অভিমুখী ইকবাল শফির পুরো ব্রিগেডকে তছনছ করে দেই। ইকবাল শফি দিশাহারা হয়ে জিপ থেকে লাফ দিয়ে পাহাড়ে ঢুকে জীবন বাঁচায়। মারা যায় পাকিস্তানি বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এই তিনটা ঘটনা পুরো যুদ্ধটিকে একটি বিশেষ ধারায় নিয়ে গেছে। তা না হলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটা হয়তো অন্য ধরনের হতো। ২৪ ও ২৫ তারিখের অ্যাকশন দুটো না নিলে হয়তো চট্টগ্রামে রেডিও স্টেশনে গিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করাও সম্ভব হতো না।Untitled-2 copy
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি সেশন ঢাকায় বসার কথা ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দলের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার গঠন করবেন। ১ মার্চ দুপুরে হঠাৎ পাকিস্তানের তৎকালীন শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা দিলেন। সমস্ত বাংলার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। বঙ্গবন্ধু ২ তারিখ ঢাকায় ও ৩ তারিখ সারা দেশে হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। আরও বললেন, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণে তিনি বাঙালি জাতির জন্য পরবর্তী করণীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেবেন। আমি তখন সেনাবাহিনী থেকে ডেপুটেশনে ইপিআর’র চট্টগ্রাম সেক্টরে অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত। ২৮ ফেব্রুয়ারি সোয়াত নামের একটি জাহাজ ১০ হাজার টন অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে চট্টগ্রামের বহির্নোঙরে আসে। এই অস্ত্র যে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে নয়, বাঙালির আন্দোলন দমন করতে আনা হয়েছে এটা বুঝে গিয়েছিলাম। কারণ, সীমান্তে তখন কোনো উত্তেজনা ছিল না। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে আমিও যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করি। তখন ইপিআরে শতকরা ৮০ ভাগ সৈনিক ও জেসিও ছিল বাঙালি। ২০ ভাগ ছিল অবাঙালি। সিদ্ধান্ত নিলাম ওরা আক্রমণ করার আগে আমি আক্রমণ করব। না হলে আমাদের জয়ের সম্ভাবনা কম। আমার কাছে স্পষ্ট ছিল যে, পাকিস্তান আক্রমণ করলে তাদের প্রথম লক্ষ্য হবে বাঙালির রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সহকর্মীরা। এরপর লক্ষ্য হবে সামরিক বাহিনীর বাঙালি অফিসাররা যারা পাকিস্তানের বিপক্ষে যুদ্ধে জনগণকে ও সৈনিকদেরকে নেতৃত্ব দিতে পারবে। ইপিআর’র বাঙালি অফিসারদের সঙ্গে গোপনে পরামর্শ করি।
তখন সীমান্তসহ চট্টগ্রাম ইপিআরে ১ হাজার ২০০ বাঙালি ও পাঁচ-ছয় শ অবাঙালি সৈন্য ছিল। পরিকল্পনা ছিল, শুরুতে সীমান্তে সব অবাঙালি সৈন্যদের নিষ্ক্রিয় করে বাঙালি সৈন্যরা শহরে এসে আমার নির্ধারিত জায়গাগুলোতে অবস্থান নেবে, যাতে কোনো পাকিস্তানি সৈন্য ক্যান্টনমেন্ট বা নেভাল বেস থেকে বের হতে না পারে। ঢাকা থেকে পাকিস্তানি সৈন্য আসা আটকাতে প্রয়োজন ফেনী নদীর পাড়ে শুভপুর ব্রিজ এলাকা এবং মহুরি নদীর ওখানে ধুমঘাট রেলওয়ে ব্রিজ এলাকায় ডিফেন্স নেওয়া। দরকার অতিরিক্ত সৈন্য। এ জন্য দুইটা সোর্স আছে। একটা হলো চট্টগ্রাম ষোলো শহরে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এখানে আড়াইশর মতো বাঙালি সৈন্য ছিল। আর চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে ১ হাজার ৮০০-এর মতো বাঙালি সৈন্য। অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি অফিসাররা যদি ক্যান্টনমেন্ট থেকে অল্প একটু দূরে গিয়ে পাহাড় থেকে বেলুচ রেজিমেন্ট নামের অবাঙালি রেজিমেন্টের সৈন্যদের বন্দী করতে পারে, তাহলে ক্যান্টনমেন্টের ১ হাজার ৮০০ বাঙালি সৈন্যও আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারবে। এ জন্য মেজর জিয়াউর রহমান ও কর্নেল চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিকল্পনা জানাই। ইপিআরের বিশ্বস্ত কয়েকজনকে নিয়ে তিনটি প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করলাম। পাকিস্তানিরা হামলা করার আগেই অবাঙালি সৈন্য যারা ইপিআর-এ আছে, তাদেরকে বন্দী বা ধ্বংস করা; পুরো চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের রক্ষা করা। ৭ মার্চের ভাষণে বড় ধরনের ঘোষণা আসতে পারে ভেবে ৬ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দিলেন যে, ২৫ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন আবার বসবে। অন্যদিকে অব্যাহত থাকল পাকিস্তানি সৈন্য আসা। সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র নামাতে ২৪ মার্চ সেখানকার বাঙালি ব্রিগেট কমান্ডারকে সরিয়ে আনসারি নামের এক অবাঙালি অফিসারকে দেওয়া হলো। দায়িত্ব নিয়েই আনসারি অস্ত্র নামাতে অস্বীকৃতি জানানো বাঙালি শ্রমিকদের হত্যা শুরু করল। ধারণা করলাম, রাতেই পাকিস্তানিরা হামলা চালাতে পারে। ওয়্যারলেসে সাংকেতিক যোগাযোগের জন্য আমি দুটো কোড ওয়ার্ড সিলেক্ট করেছিলাম। এক. ‘অ্যারেঞ্জ সাম উড ফর মি’ অর্থাৎ আমার জন্য কিছু কাঠের ব্যবস্থা কর। আরেকটি ছিল ‘ব্রিং সাম উড ফর মি’ অর্থাৎ, আমার জন্য কিছু কাঠ নিয়ে শহরে আস। প্রথম বার্তাটির পেছনের অর্থ ছিল আধা ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ শুরু করতে হবে, তৈরি হয়ে নাও। দ্বিতীয় বার্তাটির গোপন অর্থ ছিল যুদ্ধ শুরু কর, পাকিস্তানিদেরকে নিরস্ত্র, বন্দী, ধ্বংস কর, শহরে এসে তোমার জন্য নির্ধারিত স্থানে অবস্থান নাও, শহরকে দখলে রাখতে হবে। দুটো বার্তাই পাঠিয়ে দিলাম। বার্তা পাঠানোর ঘণ্টাখানেক পর বেবিটেক্সিতে করে মেজর জিয়া ও কর্নেল চৌধুরী সাহেব আসেন। আলোচনা চলছে এমন কথা বলে তারা আমার সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি হলেন না। বাধ্য হয়ে ফোনে দ্বিতীয় বার্তাটি স্থগিত করতে বললাম। ততক্ষণে দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। অবাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করে শহরের দিকে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাঙালি সৈন্যরা। পরদিন ২৫ মার্চ রাতে আমি খাবার টেবিলে। এমন সময় আওয়ামী লীগ নেতা ডা. জাফর আসলেন। বললেন, ইয়াহিয়া খান রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে গোপনে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে সেখান থেকে বিমানে পাকিস্তান চলে গেছে। আলোচনা ব্যর্থ। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পশ্চিমা সৈন্যরা রাতের খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলেছে। গাড়িতে অস্ত্রপাতি বসানো হচ্ছে। ট্যাংকগুলো প্রস্তুত হচ্ছে। আমি স্থগিত করা বার্তাটি আবার পাঠিয়ে দিলাম। শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। ৮টা ৪০ মিনিটে ঘর থেকে বেরিয়ে ওয়্যারলেস কলোনি এলাকায় ইপিআরের অবাঙালি অফিসার ক্যাপ্টেন হায়াতকে বন্দী করি। দুই ঘণ্টার মধ্যে হালিশহরের সব অবাঙালি সৈন্য ও অফিসারকে বন্দী করে হাত বেঁধে রুমে আটকে ফেলি। সব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ডিফেন্স নেই। শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেই। জিয়াউর রহমান তার সৈন্যদের নিয়ে কক্সবাজারের দিকে চলে যান। তিনি ক্যান্টনমেন্টে না যাওয়ায় ক্যান্টনমেন্টের অবাঙালি বেলুচ রেজিমেন্ট বাঙালিদের আক্রমণ করে। সবার আগে কর্নেল চৌধুরী সাহেবকে হত্যা করে।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *