November 17, 2019

এইমাত্র পাওয়া সংবাদ

অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার ইতিহাস (অংশ-৩)

77

বাঙালি জাতি বা বাঙ্গালি জাতি হল একটি আর্যীয় জাতির অংশ। প্রায় ১৫০০ বছর আগে প্রধান আর্যীয় ভাষা সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত ভাষা র মাধ্যমে আধুনিক বাংলা ভাষা এবং ব্রাহ্মী লিপি থেকে সিদ্ধম লিপির মাধ্যমে আধুনিক বাংলা লিপির সৃষ্টি হয়েছে। মুলত আর্যদের ই বাঙালি বোঝানো হয় কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন অষ্ট্রিক নিগ্রিটো আরবি জাতি এসে মিশেছে। বাংলা ভাষা প্রথম স্বীকৃতি পায় পশ্চিমবঙ্গে।

এছাড়া ও ভারতের [ঝাড়খন্ড,আসাম, ত্রিপুরা, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের][বাংলাদেশ] মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, মালয়েশিয়া, মায়ানমার, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি সহ সারাবিশ্বে অনেক প্রবাসী বাঙালি আছেন।

ইতিহাস

বাঙালি জাতির ইতিহাসকে আদি বা প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগে ভাগ করা যায়।

প্রাচীন ইতিহাস

আগে এদেশের সভ্যতাকে অনেকেই অর্বাচিন বলে মনে করলেও বঙ্গদেশে চার হাজারেরো বেশি প্রাচীন তাম্রাশ্ম (chalcolithic) যুগের সভ্যতার নির্দশন পাওয়া গেছে [২৪][২৫] যেখানে দ্রাবিড়, তিব্বতী-বর্মী ও অস্ট্রো-এশীয় নরসম্প্রদায়ের বাস ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। বঙ্গ বা বাংলা শব্দটির সঠিক বুৎপত্তি জানা নেই তবে অনেকে মনে করেন এই নামটি এসে থাকতে পারে দ্রাবিড় ভাষী বং নামক একটি গোষ্ঠী থেকে যারা এই অঞ্চলে আনুমানিক ১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বসবাস করত। [২৬] ডঃ অতুল সুরের মতে “বয়াংসি” অর্থাৎ পক্ষী এদের টোটেম ছিল। আর্যদের আগমনের পর বাংলা ও বিহার অঞ্চল জুড়ে মগধ রাজ্য সংগঠিত হয় খ্রীশষ্টপূর্ব সপ্তম শতকে। বুদ্ধের সময় মগধ ছিল ভারত উপমহাদেশের চারটি মহাশক্তিশালী রাজত্বের অন্যতম ও ষোড়শ মহাজনপদের একটি। বংশের চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজত্বের সময় মগধের বিস্তার হয় দক্ষিণ এশিয়ার এক বিশাল অঞ্চলে। খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের সময় আফগানিস্তান ও পারস্যের কিছু অংশও মগধের অধিকারভুক্ত ছিল। বৈদেশিক রচনায় বাংলার প্রথম উল্লেখ দেখা যায় গ্রিকদের লেখায় ১০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি। তাতে বর্ণিত আছে গাঙ্গেয় সমতলভুমিতে বাসকারী গঙ্গাঋদ্ধি নামে জাতির শৌর্যবীর্যের কথা যা শুনে মহাবীর আলেক্সান্ডার তাঁর বিশ্ববিজয় অসম্পূর্ণ রেখে বিপাশার পশ্চিম তীর থেকেই প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। গঙ্গারিডি শব্দটি হয়ত গ্রিক Gangahrd (গঙ্গাহৃৎ) থেকে এসে থাকবে— গঙ্গা-হৃৎ অর্থাৎ গঙ্গা হৃদয়ে যে ভুমির।[২৭] খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতকে মগধে গুপ্ত রাজবংশের পত্তন হয়।

মধ্যযুগ

বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা বলা হয় শশাঙ্ককে যাঁর রাজত্ব ছিল সপ্তম শতকের গোড়ার দিকে[২৮]। তারপর কিছুদিন অরাজকতার পর বৌদ্ধধর্মাবলম্বী পাল বংশ এখানে চারশো বছর রাজত্ব করে, তারপর অপেক্ষাকৃত কম সময় রাজত্ব করে ব্রাহ্মণ্য হিন্দু ধর্মীয় সেন বংশ। বাংলা অঞ্চলে প্রথম ইসলামের প্রচার হয় দ্বাদশ শতকে সুফী ধর্মপ্রচারকদের দ্বারা। পরবর্তীতে বাংলা ইসলামি রাজত্বের অধিকারভুক্ত হলে বাংলায় প্রায় সব অঞ্চলেই দ্রুত ইসলামের প্রসার ঘটে[২৯]। দিল্লির দাস বংশের সুলতানির একজন তুর্কী সেনাপতি বখতিয়ার খলজী সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে বাংলার এক বিশাল অংশ দখল করেন। অতঃপর দিল্লির বিভিন্ন সুলতান রাজবংশ বা তাদের অধীনস্থ স্থানীয় সামন্ত রাজারা বাংলায় রাজত্ব করে। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের সুচনা হয় যা দুই শতাব্দীরও বেশি সময় স্থায়ী হয়েছিল। ষোড়শ শতকে মুঘল সেনাপতি ইসলাম খান বাংলা দখল করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে দিল্লির মুঘল সরকারের নিযুক্ত শাসকদের হাত ছাড়িয়ে আপাত-স্বাধীন মুর্শিদাবাদের নবাবদের রাজত্ব শুরু হয়, যাঁরা দিল্লির মুঘল সরকারের শাসন কেবল নামে মাত্র মানতেন।

বাংলার নবজাগরণ

বাংলার নবজাগরণ বলতে বোঝায় ব্রিটিশ রাজত্বের সময় অবিভক্ত ভারতের বাংলা অঞ্চলে ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের জোয়ার ও বহু কৃতি মনীষীর আবির্ভাবকে। মুলত রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭৫-১৮৩৩) সময় এই নব জাগরণের শুরু এবং এর শেষ ধরা হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) সময়ে, যদিও এর পরেও বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ এই সৃজনশীলতা ও শিক্ষাদীক্ষার জোয়ারের বিভিন্ন ধারার ধারক ও বাহক হিসাবে পরিচিত হয়েছেন[৩০]। ঊনবিংশ শতকের বাংলা ছিল সমাজ সংস্কার, ধর্মীয় দর্শনচিন্তা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, দেশপ্রেম ও বিজ্ঞানের পথিকৃৎদের এক অনন্য সমাহার যা মধ্যযুগের যুগান্ত ঘটিয়ে এদেশে আধুনিক যুগের সূচনা করে[৩১]

নবজাগরণ ভাবাপন্ন ব্যক্তিবর্গের মধ্যে রামমোহন রায় , এইচ.এল.ভি ডিরোজিও ও তাঁর বিপ্লবী শিষ্যবৃন্দ, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর অনুসারীগণ, অক্ষয়কুমার দত্ত , ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর , মাইকেল মধুসূদন দত্ত , বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় , স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল (প্রতিষ্ঠিত, ১৭৮৪), শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশন (১৮০০), ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০), হিন্দু কলেজ (১৮১৭), ক্যালকাটা স্কুল-বুক সোসাইটি (১৮১৭), কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ (১৮৩৫), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর (১৮৫৭) মতো প্রতিষ্ঠানগুলি বাংলার নবজাগরণে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে।

বাংলার নবজাগরণ দুই ধারায় প্রসার লাভ করে যথা, (১) ঐ সময়ে বহু সংখ্যক সংবাদপত্র ও সাময়িকী প্রকাশিত হয় এবং (২) বহু সমিতি, সংগঠন ও সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলি পর্যায়ক্রমে নবজাগরণর দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন সংলাপ ও বিতর্কের মঞ্চ হিসেবে কাজ করে। তবে নবজাগরণের সবচেয়ে দর্শনীয় বহিঃপ্রকাশ ঘটে কতকগুলি সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এসব আন্দোলন ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক। নবজাগরণর আরও বড় ধরনের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় যুক্তিভিত্তিক মুক্তচিন্তার সপক্ষে পরিচালিত ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনের মাধ্যমে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উন্মেষ, পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ধ্যান-ধারণার প্রসার ও বিভিন্নমুখী বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানানুসন্ধান এ সবই ছিল নবজাগরণর সুফল। বাংলার নবজাগরণ বা নবজাগরণের ফলে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত হয় এবং পরবর্তী সময়ে এ জাতীয়তাবাদ দেশের পরাধীনতার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

সূত্র- উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে, সংগ্রহে- মোঃ ইসমাইল হোসেন মানিক পাটওয়ারী।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *