April 24, 2018

এইমাত্র পাওয়া সংবাদ

আমেরিকায় দক্ষ কর্মী তৈরির কারিগর

প্রতি বছর স্বপ্ন পূরণের আশায় বহু বাঙালি প্রবাসে পাড়ি জমান। কিন্তু নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতা না থাকায় অধিকাংশকেই বেছে নিতে হয় ট্যাক্সি চালনা, রেস্টুরেন্টের কাজসহ নানা রকম ‘অড জব’।

আমেরিকায় দক্ষ কর্মী তৈরির কারিগর

প্রতি বছর স্বপ্ন পূরণের আশায় বহু বাঙালি প্রবাসে পাড়ি জমান। কিন্তু নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতা না থাকায় অধিকাংশকেই বেছে নিতে হয় ট্যাক্সি চালনা, রেস্টুরেন্টের কাজসহ নানা রকম ‘অড জব’।এর কারণ হচ্ছে তাদের সঠিক মানের দক্ষতার অভাব। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যে মাপের দক্ষতা চায় সেটা আমাদের দেশ থেকে যাওয়া লোকজনের মধ্যে অনুপস্থিত। ফলে ওখানে গিয়ে যখন কোনো শ্রমিক বুঝতে পারেন তার দক্ষতার অভাব রয়েছে তখন করার কিছু থাকে না। সেখানে জীবনযাপনের জন্য করতে হয় প্রচুর পরিশ্রম। কিন্তু একটু দক্ষতা তাদের আয়ের পরিমাণ যেমন বাড়িয়ে দিতে পারে, ঠিক তেমনি সামাজিকভাবেও প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ থাকে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো প্রশিক্ষণের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন প্রবাসী বাংলাদেশি আবুবকর হানিপ। চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে ডিভি লটারি জিতে ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র যান কুমিল্লার লাঙ্গলকোট এলাকার সন্তান আবুবকর হানিপ। এরপর কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্সসহ ওরাকল ডিবিএ, সিস্টেম অ্যাডমিনসহ যাবতীয় সার্টিফিকেশন অর্জন করে এফডিআইসি, আইআরএস, ডিওডি, আইবিএম এবং ওরাকল কোম্পানিতে কাজ করেন। এর মধ্যেই প্রবাসী আমেরিকানদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন পিপল এন টেক।২০০৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচিত হতে শুরু করে পিপল এন টেক। এরপর কানাডা এবং ভারতেও তাদের শাখা অফিস খোলা হয়। ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশেও অফিস খুলেছেন তারা। দক্ষ কর্মী তৈরির কারিগর আবুবকর হানিপ ও তার প্রতিষ্ঠানকে নিয়েই এবারের শেষ প্রচ্ছদ।

 

স্বপ্নের আমেরিকা ও পিপল এন টেকের শুরুর গল্প

আবুবকর হানিপ দারুণ বিনয়ী সদালাপী মানুষ। কথায় কথায় অনেক অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন। এর ফাঁকে জানতে চাওয়া হলো আমেরিকা যাওয়ার গল্প। হানিপ বললেন, ‘চুয়েট থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ থেকে প্রকৌশল ডিগ্রি পাওয়ার পর ১৯৯৬ সালে আমেরিকা পাড়ি জমাই। দুচোখে কত স্বপ্ন! কিন্তু অল্পতেই সব ফিকে হয়ে এলো, বাস্তব অনেক কঠিন। কারণ আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সেখানে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখল না। এরপর ভিন্ন লড়াই শুরু। ’

এরপর এক বছরের মাথায় সেখানে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর কোর্স করলেন। ২০০১ সালে স্নাতকোত্তর সনদ মিললেও ভালো চাকরি তখনো অধরা। এর মধ্যেই স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণের সন্ধান পেয়ে নেমে পড়লেন হানিপ। শিখলেন অনেক কিছু। এবার ৭৫ হাজার মার্কিন ডলার বার্ষিক বেতনে চাকরি মিলল। আমেরিকা যাওয়ার পর এটি তার সবচেয়ে ভালো চাকরি। এই অভিজ্ঞতা হানিপকে দারুণভাবে আলোড়িত করল। তিনি অনুভব করলেন এখানে চাকরি পাওয়া খুব বেশি কঠিন নয়। কিন্তু না জানলে ঠিকই কষ্ট করতে হয়। একটু গাইডলাইনেই পাল্টে যেতে পারে সবকিছু! তার ভাষায়— ‘বিষয়টি নিয়ে আশপাশের অনেক বন্ধুর সঙ্গে কথা বললাম। অনেকে পাত্তা দিল না। আবার দুয়েকজন বিশ্বাস করল। এর মধ্যে এক বন্ধু বাংলাদেশ থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক পাস করে ওখানে ট্যাক্সি চালাত। তার একটি গ্যারেজও ছিল। সে আমার কাছে প্রশিক্ষণ নিল। মাত্র দেড় মাসের মাথায় আইবিএম-এ তার চাকরি হলো। বাৎসরিক বেতন ১ লাখ ডলার। আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল। আস্তে আস্তে লোক বাড়তে থাকল। কয়েক মাসের মাথায় ৩ তলা একটি বাড়ি কিনে ফেললাম। সেই বাড়ির নিচতলায় শুক্রবার রাতে এসে তারা থাকত। শনি ও রবিবার তাদের পড়াতাম। প্রথম দিকে কোনো ফি নিতাম না। অনেকে খুশি হয়ে ৫০০-১০০০ ডলার দিত। এভাবেই প্রায় ৩০০ লোকের ভাগ্য পাল্টাল। আর পিপল এন টেক পেল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। ’ পরের গল্প কেবলই এগিয়ে চলার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছে এর পাঁচটি শাখা। এ ছাড়া বাংলাদেশ, কানাডা এবং ভারতেও শাখা রয়েছে। পিপল এন টেক মূলত শিক্ষিত ইমিগ্র্যান্টদের আইটি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এসব কোর্সের মধ্যে রয়েছে সফটওয়্যার টেস্টিং, বিজনেস অ্যানালিস্ট, ডেটাবেইজ এডমিনিস্ট্রেশন, প্রজেক্ট ম্যানেজম্যান্ট প্রফেশনালস ইত্যাদি।

 

প্রশিক্ষণার্থীদের বাৎসরিক আয় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার!

পিপল এন টেক অফিশিয়ালি যাত্রা শুরুর পর প্রায় ৫ হাজারের বেশি কর্মীর স্কিল ডেভেলপে ভূমিকা রেখেছে। এরা প্রত্যেকেই এখন সম্মানজনক চাকরি করছেন। তাদের বাৎসরিক মোট আয় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এদের অধিকাংশই আমেরিকায় প্রথমবার আসা। ফলে তাদের আয়ের একটা বড় অংশ প্রবাসী আয় হিসেবে চলে আসে বাংলাদেশে। সেটা যদি মোট আয়ের ২০ ভাগও হয় তাহলে বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তার মানে হচ্ছে বছরে প্রশিক্ষণার্থীরা কমপক্ষে ৮০০ কোটি টাকা দেশে পাঠাচ্ছেন। আবুবকর হানিপ নিশ্চয়তা দিয়ে জানালেন, এ পরিমাণটা ৮০০ কোটি টাকার বেশিই হবে, কম হওয়ার সুযোগ নেই কোনোমতেই।

 

শুধুই প্রশিক্ষণ নয়…

পিপল এন টেক কেবল মানুষকে কাজ পাইয়ে দেওয়াই নয়, তাদের কাজে টিকে থাকার এবং ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের উপায়ও বাতলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের পর কাজ পেলেও সেটা চলে যায়। কিন্তু পিপল এন টেকের গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে সেটা ঘটে না। কেউ একবার পিপল এন টেকের প্রশিক্ষণার্থী হলে সারা জীবনের জন্য তিনি এর সুবিধাভোগী কিংবা কর্মী। সে হিসেবে পিপল এন টেক স্রেফ কোনো ব্যবসা বা প্রশিক্ষণকেন্দ্র নয়, এটি একটি সহায়তাকেন্দ্রও বটে। বর্তমানে পিপল এন টেকের প্রতিটি কোর্স ৪ মাসের, যার জন্য  প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে দিতে হয় ৪ হাজার ডলার করে। তবে একবার পে করে যতদিন না পুরোপুরি তৈরি হন, ততদিনই কোনো প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ নিতে পারেন এ সেন্টারে। প্রশিক্ষণের বাইরে তারা জব প্লেসমেন্ট, কাউন্সিলিং, প্রজেক্ট সম্পর্কে ধারণা, ডাক পাইয়ে দেওয়া, সাক্ষাৎকার দেওয়ার পদ্ধতি শিখিয়ে দেন। ফলে কাজ পেতে কষ্ট হয় না, কিংবা সময়ও লাগে না।

 

প্রশিক্ষণ সেবা এবার বাংলাদেশেও

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাংলাদেশি তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পিপল এন টেক ২০১৪ সালে বাংলাদেশেও তাদের কার্যালয় খুলেছে। এ প্রসঙ্গে পিপল এন টেকের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আবুবকর হানিপ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর কাজ করে অনেকেই প্রশিক্ষণ নিতে পারেন না। কিংবা অসুবিধা হয়। কিন্তু তারা যদি এখানে থেকেই প্রশিক্ষিত হয়ে যেতে পারেন তাহলে কিন্তু সেখানে গিয়ে আর অড জব করতে হবে না। আবার বিদেশ যেতে না চাইলে কেউ ঘরে বসেই আউটসোর্সিং করে প্রচুর টাকা উপার্জন করতে পারবেন। মূলত আইটি সেক্টরে প্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরিই আমার মূল লক্ষ্য। ’

জানা গেছে,  যুক্তরাষ্ট্রে ৪০০০ মার্কিন ডলারের মাধ্যমে ৪ মাসের যে কোর্স করানো হয় বাংলাদেশে সেসব কোর্স করানো হবে ন্যূনতম ৬ মাস এবং কোর্স ফি হবে ৩ হাজার ডলার। এখানে একজন মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত চাকরি উপযোগী হিসেবে গড়ে উঠবে না ততদিন পর্যন্ত তাদের শেখানো হবে। গুরুত্বের সঙ্গে করপোরেট এবং টেকনিক্যাল ইংরেজিও শেখানো হবে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষকের মাধ্যমেই পাঠদান করানো হবে। তবে এ দেশের স্থানীয় মানুষের পিপল এন টেকের অভিজ্ঞ শিক্ষকের মতো যোগ্য করে গড়ে তোলা হবে। সফটওয়্যার টেস্টিং, বিজনেস অ্যানালিস্ট, ডেটাবেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বেসিক কম্পিউটার— এ চারটা জিনিসকে যৌথভাবে একটা প্যাকেজ তৈরি করে কোর্সের সিলেবাস তৈরি করা হয়েছে। আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেসব কাজের চাহিদা বেশি সেগুলো এর মধ্যে অন্তুর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমরা ৫০ শতাংশ অস্বচ্ছ এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকি। বাংলাদেশে ৩০টির উপরে কোর্স করানো হচ্ছে অত্যন্ত স্বল্প ফিতে। বেসিস, আইডিবির কোর্সগুলোও এখানে শেখানো হয়।

 

আইটির পিঠে চড়ে পাল্টে যেতে পারে বাংলাদেশ

আবুবকর হানিপ মনে করেন আইটির পিঠে চড়ে পাল্টে যেতে পারে বাংলাদেশ। তবে সেজন্য এই সেক্টরের বিকাশের অন্তরায়গুলো দূর করতে হবে। যদি সেটা সম্ভব হয় তাহলে তথ্য-প্রযুক্তি (আইটি) খাত থেকে প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এতে করে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪০ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। আমরা বিপ্লব ঘটাতে চাই। আইটি সেক্টরের জন্য ব্যাংক ঋণের সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি শর্তসমূহ সহজ করতে হবে। পিপল এন টেকসহ বহু উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা দেশের অভ্যন্তরীণ অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজে ভূমিকা রাখতে পারে। এরকম প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগানোর একটা জোর দাবি জানান আবুবকর হানিপ।

ধারণা নিতে পারেন আপনিও

দেশের মানুষের সেবা দেওয়ার জন্য পিপল এন টেক সবসময় উন্মুখ থাকে। যে কোনো প্রয়োজনে যে কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। পিপল এন টেক বিষয়ে আরও জানতে যোগাযোগ করতে পারেন www.piit.us ঠিকানায়। মেইল করতে পারেন jobs@piit.us এই ঠিকানায়। বাংলাদেশে মোবাইলে যোগাযোগ করা যাবে ০১৬১১-৪৪৬৬৯৯ নম্বরে এবং যুক্তরাষ্ট্রে যোগাযোগ +১৮৫৫৫৬২৭৪৪৮ নম্বরে।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *