June 23, 2018

এইমাত্র পাওয়া সংবাদ

এই কোচদের বিদায়ও ছিল অস্বাভাবিক!

কোচ আসে কোচ যায়। থেকে যায় কিছু স্মৃতি আর বিতর্ক। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচ-কাহনে এটাই যেন নিয়তি! গর্ডন গ্রিনিজ থেকে চণ্ডিকা হাথুরুসিংহে পর্যন্ত বেশির ভাগ কোচের প্রস্থানেই থেকে গেছে প্রশ্ন। ঠিক যেন স্বাভাবিক নয়। হাথুরুসিংহের কথাই ধরুন, বাংলাদেশ ক্রিকেটে দারুণ কিছু সাফল্য এনে দেওয়া লঙ্কান কোচের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার ঘটনাটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। বেশ আগে থেকেই নানাভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়ে আসছিলেন হাথুরুসিংহে। তাঁর আগে এমন আরও কয়েকজন কোচ ছিলেন, যাঁদের প্রস্থানও ঠিক স্বাভাবিক ছিল না। আসুন, জেনে নিই সেসব কোচের কথা—

আকরাম-আমিনুলদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল গ্রিনিজ। ছবি: ক্রিকইনফো
গর্ডন গ্রিনিজ (১৯৯৬-১৯৯৯)
মহিন্দর অমরনাথ ব্যর্থ হওয়ার পর বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নে বিভোর ছিল বাংলাদেশ। আকরাম খান-আমিনুল ইসলাম বুলবুলদের কোচ হিসেবে তাই উড়িয়ে আনা হয়েছিল গর্ডন গ্রিনিজকে। ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফিতে দেশকে শিরোপা জিতিয়ে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এ ওপেনার। তাঁর হাত ধরেই ১৯৯৯ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই বিশ্বকাপেই বরখাস্ত হন গ্রিনিজ, সেটাও আবার জাতীয় দলের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার এক দিন আগে! গ্রিনিজের মতো সমীহ জাগানিয়া ব্যক্তিত্বকে বোর্ড এভাবে বরখাস্ত করায় প্রশ্ন উঠেছিল ক্রিকেটে আমাদের ভদ্রতাজ্ঞান নিয়েও।
কথিত আছে, নিরানব্বই সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে টেস্ট মর্যাদার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন গর্ডন। আর তাতেই ক্রিকেট বোর্ডের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরাগভাজন হন। অনেকেই বলেন, বিশ্বকাপের সময় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গর্ডন গ্রিনিজকে বরখাস্ত করে অপদস্থ করার এক অসভ্য পরিকল্পনা হয়েছিল পর্দার অন্তরালে। টেস্ট মর্যাদা নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত মত দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ। তবে আসলেই কী হয়েছিল, তা আজও অজানা।

বিদায়ের সময় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বারলো। ছবি: ফাইল ছবি
এডি বারলো (১৯৯৯-২০০১)
এডি বারলো—বাংলাদেশ ক্রিকেটে এক আবেগের নাম, যিনি বিদায় নেওয়ার সময় এ দেশের প্রতি ভালোবাসার টানে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। যদিও তাঁর এ বিদায়ে বোর্ডের কোনো বিতর্কিত ভূমিকা ছিল না। কিন্তু তারপরও বারলোর বিদায়টা ঠিক স্বাভাবিক ছিল না। দেশের ক্রিকেটীয় অবকাঠামো নির্মাণে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখা বারলোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাঁরই ভাগ্য! টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর গোটা দেশ যখন অধীর আগ্রহে অভিষেক টেস্টের দিন গুনছে, ঠিক তখনই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন সাবেক এ প্রোটিয়া অলরাউন্ডার। মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়ে হারিয়ে ফেলেছিলেন চলাফেরার শক্তি। ১৭ বছর আগে আজকের দিনে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের দিনেও হুইলচেয়ারে করে তিনি ছিলেন দলের সঙ্গে। ২০০১ সালের শুরুর দিকে অপূর্ণতা নিয়েই চোখের জলে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বিদায় জানান তিনি।

বাংলাদেশের ক্রিকেটকে পিছিয়ে দিয়েছিলেন ট্রেভর চ্যাপেল। ছবি: ক্রিকইনফো
ট্রেভর চ্যাপেল (২০০১-২০০২)
চ্যাপেল ভাইয়েরা অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটে অন্য রকম এক মাদকতার নাম। বড় দুই ভাই গ্রেগ ও ইয়ান খ্যাতি কুড়োলেও ট্রেভরের কপালে কুখ্যাতি জুটেছিল ‘আন্ডারআর্ম’ বোলিংয়ের জন্য। ২০০১ সালের এপ্রিলে বিদেশের মাটিতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে জিম্বাবুয়ে যাওয়ার আগে সেই ট্রেভরকে বাংলাদেশের কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল বিসিবি। কিন্তু খেলোয়াড়দের সঙ্গে তিনি কখনোই সহজ হতে পারেননি। পারেননি বন্ধুর মতো আপন করে নিতে, আবার কড়া হেডমাস্টারও নয়। অভিভাবক হিসেবে শিষ্যদের ব্যর্থতা আড়াল করার বদলে অনেক খেলোয়াড়ই তাঁর বলি হয়েছিলেন। ‘ভাষা সমস্যা’ ছাড়াও সেই সময় মাশরাফিকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করার দায়টাও বর্তায় ট্রেভরের ওপর। এ ছাড়া সে সময় দলের দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান আকরাম খান ও আমিনুল ইসলামকে পরিকল্পিতভাবে টেস্ট দলের বাইরে ঠেলে দেওয়ার জন্য অনেকেই তাঁকে দায়ী করেন। ঘরের মাঠে দুটি আর বিদেশে একটি—এই মোট তিনটি সিরিজেই দলের বাজে অবস্থা দেখে ট্রেভরের চুক্তি না বাড়ানোর সিদ্ধান্তই নিয়েছিল বিসিবি। অর্থাৎ ট্রেভরের বিদায়টাও স্বাভাবিক ছিল না।

দুঃস্বপ্ন হয়ে এসেছিলেন মহসিন কামাল। ছবি: সংগৃহীত
মহসিন কামাল-আলী জিয়া (২০০২-২০০৩)
ক্রিকেট ইতিহাসে বিরল নজির গড়ে সেই সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোচ ছিলেন দুজন! মহসিন কামাল ও আলী জিয়া। ২০০২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ দলের কোচ হয়ে এসেছিলেন পাকিস্তানের সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার মহসিন কামাল। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন জীবনে কখনো টেস্ট না খেলা আলী জিয়াকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট তাঁদের সময়টা রীতিমতো দুঃস্বপ্নের মতো। সে সময়কার অনেক ক্রিকেটারই কৌতুকভরে মহসিনের একটি অভ্যাসের কথা তুলে ধরেন। ব্যাটিং নিয়ে ব্রিফিংয়ে সময় তিনি নাকি একটা কথাই সব সময় বলতেন—‘সিধা খেলো ভাই!’ এই দর্শনেই তিনি বদলে দিতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে! তাঁদের অধীনে টানা ম্যাচ হারায় বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিল ক্রিকেট বিশ্বের হাস্যরসের খোরাকে। ২০০৩ বিশ্বকাপে ভীষণ বাজে পারফরম্যান্সের পর তাই স্বাভাবিকভাবেই চাকরি হারান এ কোচ জুটি।

সিডন্সের হাত ধরে দিনবদলের শুরু। ছবি: প্রথম আলো
জেমি সিডন্স (২০০৭-২০১১)
ডেভ হোয়াটমোরের পাশাপাশি জেমি সিডন্সের হাত ধরেও দিনবদলের শুরু করেছিল বাংলাদেশ। এ দেশের জীবনযাপনে দারুণভাবে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াতেই বোধ হয় সিডন্স ঢুকতে পেরেছিলেন খেলোয়াড়দের মনের গভীরে। চার বছর সাকিব-তামিমদের কোচের দায়িত্ব পালনের পর মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছিল এ অস্ট্রেলিয়ানের। কিন্তু সিডন্স থেকে যেতে চেয়েছিলেন। বিসিবি তাঁকে রাখেনি। সিডন্সকে ঘিরে সমালোচনা ছিল, তিনি নাকি জাতীয় দলে নিজের পছন্দের খেলোয়াড়ের প্রতি বেশি উদার এবং অপছন্দের খেলোয়াড়দের প্রতি কঠোর। বোর্ড কর্মকর্তাদের মুখের ওপর অপ্রিয় সত্য বলে দেওয়ার ‘বদ-অভ্যাস’টাও ছিল প্রবলভাবে। যে কোচ বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মানসিকতা বদলে দিয়েছিলেন, তিনিই তাই হয়ে গেলেন ভীষণ অপছন্দের। সেটা এতটাই যে বিদায়ের বছর দু-এক পর ব্যাটিং কোচ হয়ে বাংলাদেশে ফিরতে চাইলেও বিসিবির কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন অস্ট্রেলিয়া দলের সাবেক এই সহকারী কোচ।

বাংলাদেশে বেশি দিন থাকেননি স্টুয়ার্ট ল। ছবি: এএফপি
স্টুয়ার্ট ল (২০১১-১২)
সিডন্সের পর মাত্র নয় মাস বাংলাদেশ দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেছিলেন স্টুয়ার্ট ল। ‘পারিবারিক কারণ’ দেখিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন এ অস্ট্রেলিয়ান। তাঁর সময়ে সাকিবকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছিল মুশফিকুর রহিমকে। ২০১৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ থাকলেও কী এক অজানা কারণে তার অনেক আগেই বাংলাদেশ থেকে উড়াল দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এ ব্যাটসম্যান।

পাইবাসকেও ধরে রাখতে পারেনি বিসিবি। ছবি: এএফপি
রিচার্ড পাইবাস (২০১২)
কোচ আসা-যাওয়ার এই পালায় স্টুয়ার্ট ল-এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন ইংলিশ বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকান কোচ রিচার্ড পাইবাস। বিসিবির সঙ্গে তিক্ততায় ভরা ছিল তাঁর সাড়ে চার মাসব্যাপী কোচিং অধ্যায়। চুক্তিতে সই না করেই এ দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। বিসিবির বার্ষিক ৪৫ দিনের ছুটির শর্তে পাইবাসের আপত্তি ছিল। অনুশীলনে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার না দেওয়ার ব্যাপারেও বিসিবির প্রতি অভিযোগ তুলেছিলেন পাইবাস। বিসিবির বিপক্ষে এত সব অভিযোগের পর টিকে থাকাটাই কঠিন হয়ে গিয়েছিল পাইবাসের জন্য।

অভিমানে সরে দাঁড়ান জার্গেনসন। ছবি: ফাইল ছবি
শেন জার্গেনসন (২০১২-২০১৪)
স্টুয়ার্ট ল এবং রিচার্ড পাইবাসের সহকারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল শেন জার্গেনসনের। কিন্তু ক্ষোভ আর অভিমান থেকে জার্গেনসনও ছেড়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশ দলের কোচের দায়িত্ব। তাঁর মান ভাঙাতে পারেনি বিসিবি। বিদায় নেওয়ার সময় খেলোয়াড়েরা তাঁকে প্রাপ্য সংবর্ধনা দিলেও বিসিবি কর্তাদের তেমন গরজ ছিল না।0786113420b3d13dc87e2a1528040537-5a0677d17e594

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *