October 16, 2018

এইমাত্র পাওয়া সংবাদ

ছয়শ’ কোটি টাকা ব্যয় শেষে বাতিল হচ্ছে ৪০ প্রকল্প

 

বৈদেশিক অর্থায়ন না পাওয়াসহ নয় কারণে স্থবির অবস্থা বিরাজ করছে ৪০ উন্নয়ন প্রকল্পে। এর মধ্যে ৫টির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। মন্থর গতির ৩৫টি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি পাঁচ ভাগেরও নিচে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত (এডিপি) থাকলেও কাজ শুরুর আগেই বেশ কিছু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্পগুলো এডিপি থেকে বাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। ইতিমধ্যে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬শ’ কোটি টাকা। এখন প্রকল্পগুলো বাতিল হলে বড় অংকের অর্থ এবং সময়ের অপচয় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ জন্য চূড়ান্ত বাতিলের আগে দ্রুতই প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাতিলের তালিকায় মেয়াদ উত্তীর্র্ণ ও মন্থর গতির প্রকল্পগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের ১১টি প্রকল্প রয়েছে। এ ছাড়া রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আছে ৯টি প্রকল্প। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপথ মন্ত্রণালয়ের ৩টি করে প্রকল্প। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, খাদ্য, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১টি করে প্রকল্প আছে। মন্থর গতির তালিকায় আছে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) ও কনভারশন অব সিলেট ১৫০ মেগাওয়াট টু ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্টসহ বেশকিছু জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতিমধ্যে বাতিলের তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা ব্যাপক তদবির শুরু করেছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে।
পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল যুগান্তরকে বলেন, ‘এসব প্রকল্প চূড়ান্ত বাতিলের আগে আরেকবার রিভিউর জন্য আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আমি শিগগিরই মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে বৈঠক করব। বৈঠকে বিশেষ বিবেচনায় কিছু প্রকল্প রক্ষা পেলেও গুরুত্বহীনগুলো চূড়ান্ত বাতিল করা হবে।’
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বৈদেশিক অর্থ না পাওয়া, দরদাতার অভাব, সময়মতো অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় প্রকল্পগুলোর গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনে বিলম্ব, জমি অধিগ্রহণে সমস্যা, যন্ত্রপাতি সংগ্রহে দেরি, সমীক্ষায় বিলম্ব, দাতাদের সম্মতি পেতে সময়ক্ষেপণ এবং দরপত্র প্রক্রিয়া দেরি হওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
আইএমইডি সূত্র জানায়, সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা, সেফগার্ড পলিসিসমূহের সমীক্ষা, বিস্তারিত ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন, টেন্ডারিং সার্ভিস প্রদানের লক্ষ্যে কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন নিশ্চিত হয়নি। পশুর চ্যানেলের আউটার বারে ড্রেজিং প্রকল্পটি ২০০৬ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রকল্প অনুমোদনের পর পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র বিক্রি হলেও কোনো দরদাতা দরপত্র দাখিল করেনি। ২০০৮ সালে ষষ্ঠবার দরপত্র আহ্বান করা হলে ফ্রান্সের মেসার্স ইনডোপো নামের একটি ড্রেজিং কোম্পানি দরপত্র দাখিল করে। কিন্তু এ বিষয়ে পরে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২৬৪টি এমজি কোচ ও ২টি বিজি ইন্সপেকশন কার সংগ্রহ প্রকল্পটি ২০১০ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করা হয়। পরে ভারতীয় ঋণ এলওসি থেকে অর্থায়ন করা হয়নি। রফতানি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল। দীর্ঘ সাত বছরেও বিদেশী অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ শুরু করাই সম্ভব হয়নি। রফতানি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রকল্প প্রস্তুতির জন্য কারিগরি সহায়তা নামের আর একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এটি ২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংক অর্থ সহায়তা করতে রাজি হয়নি।
মন্থর গতিসম্পন্ন প্রকল্পের তালিকার অন্যতম বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা-টঙ্গী সেকশনের ৩য় ও ৪র্থ ডুয়েলগেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণ প্রকল্প। এটি ২০১২ সালে গ্রহণ করা হয়। মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১১০৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ২০৪ কোটি ১৬ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা ৯০২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। বৈদেশিক অর্থায়ন মিললেও শেষ পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা। কিন্তু গত এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের কাজই শুরু করা সম্ভব হয়নি।
এ প্রকল্পটির বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাহ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, যেসব প্রকল্প বাতিলের তালিকায় রয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার পেছনে নানা যৌক্তিক কারণ রয়েছে। প্রয়োজনীয় বলেই এসব প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এখন বাতিল হলে কিছু করার নেই। তবে বিস্তারিত কথা বলতে তিনি মন্ত্রণালয়ে যেতে বলেন।
চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্ণফুলী পানি সরবরাহ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পটি ২০১৪ সালে ৪৪৯১ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে গ্রহণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে দেশীয় অর্থায়ন ৮৫৭ কোটি ৮৮ লাখ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন ধরা হয়েছে ৩৬৩৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা। চলতি বছরের ডিসেম্বরে সমাপ্ত হওয়ার কথা। কিন্তু গত এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৬১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। দু’বছরে আর্থিক অগ্রগতি ৪ শতাংশ। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত অর্থবছরে অপ্রতুল বরাদ্দ ছিল। বর্তমানে প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কনভারশন অব সিলেট ১৫০ মেগাওয়াট টু ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট প্রকল্পটি ২০১৩ সালে গ্রহণ করা হয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সমাপ্ত করার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭০৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৫০ কোটি ৫১ লাখ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন থেকে ৬৫৭ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা ছিল। কিন্তু গত এপ্রিল পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রি-কোয়ালিফাইড দরদাতাদের কাছ থেকে পাওয়া আর্থিক প্রস্তাব সম্মতির জন্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রায় প্রতিটি প্রকল্পেরই এ রকম করুণ চিত্র বিরাজ করছে।
বিদ্যুৎ বিভাগসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রকল্পের মধ্যে যেগুলোতে বৈদেশিক সহায়তা রয়েছে সেগুলো বাতিল করা ঠিক হবে না। কেননা এতদিন জটিলতা থাকলেও এখন সেই জটিলতা কেটে গেছে। এ ছাড়া বৈদেশিক সহায়তা পেতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।
আইএমইডি সূত্র জানায়, ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মন্থর গতির তালিকায় থাকা যেসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রকল্পগুলোতে অর্থ ব্যয় হয় সেগুলো হল : পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের ১টি প্রকল্পে ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা; পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১টি প্রকল্পে ৫৭ লাখ ৫৯ হাজার টাকা; প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১টি প্রকল্পে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৮৯ হাজার টাকা; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১টি প্রকল্পে ১৩ কোটি ৫৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা; স্থানীয় সরকার বিভাগের ৩টি প্রকল্পে ১৭০ কোটি ৬৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকা; শিল্প মন্ত্রণালয়ের ৩টি প্রকল্পে ৬ কোটি ৩৬ লাখ ৬ হাজার টাকা; জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ১টি প্রকল্পে ১৩ কোটি ৮৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা; খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ১টি প্রকল্পে ১১ কোটি ৭২ লাখ ৭১ হাজার টাকা; সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ২টি প্রকল্পে ১৯ কোটি ১০ লাখ টাকা; রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ৪টি প্রকল্পে ১১ কোটি ৭ লাখ ২৬ হাজার টাকা; নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ২টি প্রকল্পে ৩ কোটি ৭৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা এবং বিদ্যুৎ বিভাগের ৯টি প্রকল্পে ৩৩৪ কোটি ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *