June 21, 2018

এইমাত্র পাওয়া সংবাদ

‘সাগর চুরি’র দায় অর্থমন্ত্রীর

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের কিছু ক্ষেত্রে ‘সাগর চুরি’ হচ্ছে। জাতীয় সংসদে খোদ অর্থমন্ত্রীর দেয়া এ বক্তব্য এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। অনেকে বলছেন, এ খাতের দুর্নীতি প্রমাণ করার জন্য এখন আর কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণের প্রয়োজন হবে না। অর্থমন্ত্রীই রাজসাক্ষী। কেননা এ সেক্টরের প্রধান হিসেবে যখন অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেন, সাগর চুরি হচ্ছে তখন এ নিয়ে ভিন্ন কোনো বক্তব্য বা যুক্তি ধোপে টিকবে না। কিন্তু এভাবে শুধু বক্তব্য দিয়ে কিংবা মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী দায় এড়াতে পারেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দেশের খ্যাতনামা বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি। বুধবার এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তাদের অনেকে যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকে যখন সাগর চুরি হয়েছে, তখন উনি কী করেছেন? আর ব্যাংক খাতে সাগর চুরির তথ্য অর্থমন্ত্রীর নিজেরই স্বীকারোক্তি। তাই তিনি কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না। কেউ কেউ বলেছেন, অর্থমন্ত্রীকেই এ বিষয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে। সেখানে উল্লেখ থাকতে হবে- কারা সাগর চুরি করেছেন এবং সে খবর তিনি কখন জেনেছেন। জানার পর তিনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের কিছু ক্ষেত্রে যে লুটপাট হয়েছে তা শুধু পুকুর চুরি নয়, সাগর চুরি। এছাড়া তিনি এও বলেন, দুর্নীতিই প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সুজন (সুশাসনের জন্য মানুষ) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক খাতে সাগর চুরির ঘটনায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দায় আছে। নিঃসন্দেহে তার বিভাগ জড়িত। দেশের অর্থ কেলেংকারির ঘটনায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায় চলে আসে। এ দায় তিনি এড়াতে পারেন না। কারণ তার পরিচালনায় অর্থব্যবস্থা বা ব্যাংক ব্যবস্থা চালিত হয়। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি। দেশের ব্যাংকিং খাতে সাগর চুরির ঘটনায় একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠনের সুপারিশ করেন তিনি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন খান যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংকে সাগর চুরি হয়েছে। উনি কী করেছেন? ব্যাংকের মালিকরা এর জন্য দায়ী। কিন্তু বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে তিনি ছেড়ে দিয়েছেন। এ জন্য দায় এড়াতে পারেন না। একইভাবে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেংকারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের আর্থিক জালিয়াতিসহ ব্যাংক খাতের অনেক বড় বড় কেলেংকারির কোনো বিচার হয়নি। ২০১০ সালে শেয়ারবাজার কেলেংকারির তদন্ত রিপোর্ট খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ জমা দিয়েছিলেন। সে রিপোর্টে যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি শুধু একেক সময় একেকভাবে বলেন, ব্যাংকে চুরি হয়েছে, ডাকাতি হয়েছে, লুট হয়েছে। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেন না। তাই পুরো অর্থ বিভাগের কর্ণধার হিসেবে অর্থমন্ত্রী শুধু বলেই দায় এড়াতে পারেন না। এ দায় তার নিজেরও। হাফিজ উদ্দিন খান মনে করেন, এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতে যারা ভালো বোঝেন তাদের নিয়ে দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং সাগর চুরির  সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অপর উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিদেশে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। আমাদের অর্থমন্ত্রীও দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করতে পারতেন। কিন্তু বাংলাদেশে সে রেওয়াজ নেই। ব্যাংকে পুকুর বা সাগর চুরি বলার চেয়ে মূল অপরাধীদের বিচার করা জরুরি। প্রয়োজনে অ্যাটর্নি জেনারেল ও প্রধান বিচারপতির সহযোগিতা নিয়ে দ্রুত বিচার কাজ সম্পন্ন করা দরকার। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। এসব না করে বিচ্ছিন্নভাবে শুধু সাগর চুরি বলে দায় এড়ানো যাবে না বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক খাতে সাগর চুরির ঘটনা অর্থ মন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না। তিনি মনে করেন, সুশাসনের অভাবে সরকারি ব্যাংক থেকে এখন বেসরকারি ব্যাংকেও কেলেংকারি ছড়িয়ে পড়েছে।  এ বিষয়ে একটি স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, বেশির ভাগ পুকুর বা সাগর চুরি হয়েছে সরকারি ব্যাংকে। আর সরকারি ব্যাংকের একক কর্তৃত্বে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী বা অর্থ মন্ত্রণালয়। সে ক্ষেত্রে তিনি এ দায় এড়াতে পারেন না। নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা অনিয়ম করলে তাদের অপসারণের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ ধরনের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেয়া হয়নি। এতে সরকার নিজেই ব্যাংক খাতে সাংঘর্ষিক আইন প্রণয়ন করেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাবেক এ চেয়ারম্যান। খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদের মতে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিভিন্ন সভা-সেমিনারে কেবল ব্যাংক খাতে পুকুর বা সাগর চুরির কথা বলছেন। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না কেন, কারা এ চুরি করছে; কেন এসব অপরাধী ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের পক্ষে মত দেন সাবেক এ ব্যাংককার। তবে কমিটিতে সরকারি কোনো লোক থাকতে পারবে না। সরকারের বাইরে ব্যাংক খাতে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে।
জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাত যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে যখন সাগর চুরি হয়েছে তখন উনি কী করেছেন? এভাবে শুধু ফাঁকা আওয়াজ ছাড়লে দায় এড়ানো যায় না। তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীকে এ বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে। এতে উল্লেখ করতে হবে, কারা সাগর চুরি করেছেন, সে খবর তিনি কখন জেনেছেন; তারপর তিনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন। এছাড়া ভবিষ্যতে কী করতে চান- এ সব শ্বেতপত্রে স্পষ্ট করতে হবে। তিনি বলেন, এ দেশে কেউ পদত্যাগ করে না। ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করেনি। তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। তার পদত্যাগ ছিল শুধু শুধু। যে দোষে তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে তার কোনো ভিত্তি নেই। বলা হয়েছে, আতিউর রিজার্ভ চুরির খবর গোপন করেছে। এ কথা সত্য নয়। আতিউরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। রিজার্ভ চুরির খবর অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মহলকে সে আগেই জানিয়েছে। তবুও তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হল বলে মনে করেন তিনি।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এমএ তসলিম যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক খাতে সাগর চুরি অর্থমন্ত্রীর নিজেরই স্বীকারোক্তি। তাই কোনোভাবেই তিনি এর দায় এড়াতে পারেন না। কারণ অর্থ মন্ত্রণালয়ে এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নামে একটি বিভাগ রয়েছে, যা আগে ছিল না। সে কারণে এসব ঘটনায় তার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি হলমার্ক কেলেংকারির ৪ হাজার কোটি টাকাকে প্রথমে বলেছেন ‘কিছুই না’ পরে বলেন চুরি। বেসিক ব্যাংক কেলেংকারির কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পরে বলল, ডাকাতি। এখন বলছেন, সাগর চুরি। এসব কী। তিনি কী বোঝাতে চান? এ পর্যন্ত আর্থিক খাত থেকে কেলেংকারির মাধ্যমে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব ঘটনায় অবশ্যই তদন্ত কমিটি হওয়া উচিত বলে মনে করেন মোহাম্মদ আলী তসলিম।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা- সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম যুগান্তরকে জানান, পুকুর বা সাগর চুরি বলার মাধ্যমে প্রকারান্তরে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করে নিচ্ছেন তার দায়। কিন্তু এ বিষয়ে কিছু ছোট উদ্যোগ ছাড়া বড় আকারে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক বিভাগে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিলেও কোনো এক অজানা কারণে তা থেমে গেছে। যখন আলোচনা উঠল তখন আবারও সে কমিশন গঠনের দাবি জানাচ্ছি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অর্থমন্ত্রী অন্তর্জ্বালায় এসব কথা বলে থাকেন। নিজের চোখে দেখেন কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন না। কারণ ব্যাংকের বড় বড় পদ, নিয়োগ, চেয়ারম্যান, এমডি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় হয়ে থাকে। অর্থমন্ত্রী শুধু ইচ্ছা পরিপালক মাত্র।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *