September 18, 2018

এইমাত্র পাওয়া সংবাদ

টাকা ফেরত আনতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু

আদালতে মামলার মধ্য দিয়ে ফিলিপাইনে বাংলাদেশকে অর্থ ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আবেদন (পিটিশন) গ্রহণ করে আদালত ২ মে শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

দেশটির সিনেট (ব্লু-রিবন কমিটি) আশা করছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার আগেই ‘উদ্ধারযোগ্য’ সব টাকা ফেরত দেয়া যাবে। ফিলিপাইনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট অ্যাকুইনো ৩০ জুন ক্ষমতা ছাড়বেন।

তবে যে আদালতে (ম্যানিলা রিজিওনাল ট্রায়াল কোর্ট) বিচার শুরু হয়েছে, এর বিচারক (নির্বাহী জজ) রেনাল্ডো এ আলহামব্রা বলেছেন, বাংলাদেশকে অর্থ ফেরত দিতে আরও বেশ কিছু প্রক্রিয়া পার করতে হবে। আর এতে সময় লাগবে। যেসব হিসাবে চুরির টাকা লেনদেন হয়েছে সেগুলো ২০ দিনের জন্য স্থগিতের নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।

ফিলিপাইনে চুরির অর্থ গিয়েছিল রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনে (আরসিবিসি)। এ ঘটনায় ব্যাংকটির কোষাধ্যক্ষ ও নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট রাউল ভিক্টর তান পদত্যাগ করেছেন।

এর আগে দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছিল ব্যাংকটি। প্রমাণ মিলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ ছাড় না করার অনুরোধ করার পরও দু’দিন ব্যাংকটির বিভিন্ন হিসাবে (অভ্যন্তরীণ) চুরির অর্থ স্থানান্তর হয়েছে।
ব্যাংক থেকে চুরির অর্থ ক্যাসিনোতে নিয়েছিল ফিলরেম সার্ভিস কর্পোরেশন। ৩৫ দশমিক ৬ মিলিয়ন পেসো (প্রায় ৬ কোটি টাকা) কর ফাঁকির অভিযোগে এ কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার মামলা করেছে দেশটির রাজস্ব বিভাগ (ব্যুরো অব ইন্টারনাল রেভিনিউ- বিআইআর)। ফিলিপাইনের গণমাধ্যম ইনকোয়ারার, র‌্যাপলার, ম্যানিলা টাইমস, ফিল স্টার ও জিএমএ অনলাইন বৃহস্পতিবার এসব তথ্য দিয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির বিষয়ে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদেনে কী আছে তা জানাতে অপারগতা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, ‘পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তা প্রকাশ করা হবে।’ অর্থ ফেরত আনতে দু’দেশের আইনগত বিষয় পর্যালোচনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে টাস্কফোর্সকে।
অর্থ ফেরতের আইনি প্রক্রিয়া শুরু : চীনা বংশোদ্ভূত ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ব্যবসায়ী কাম সিন অং ওরফে কিম অং তিন দফায় দেশটির অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলে (এএমএলসি) ৯৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার (প্রায় ৭৬ কোটি টাকা) ফেরত দিয়েছেন। আরও প্রায় ৫৪ লাখ ডলার ফেরত দেয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন তিনি।
এ অর্থ বাংলাদেশকে ফেরত দিতে ১৮ এপ্রিল (সোমবার) ম্যানিলা আঞ্চলিক বিচার আদালতে আবেদন (পিটিশন) করে এএমএলসি। জরুরি ওই পিটিশনে কিম অং, ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজর কোম্পানি, কান্ট্রিটেক্সট ট্রেডিং, আরসিবিসি এবং ফিলিপাইন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে (পিএনবি) বিবাদী করা হয়। ই-কমার্স আইনে করা মামলাটি ওইদিনই বিচারক রেনাল্ডো এ আলহামব্রা গ্রহণ করেন।

২ মে এর শুনানির দিন ধার্য করেন তিনি। তিনি এ সময় বলেন, ‘অর্থ বাংলাদেশকে দিতে আরও বেশ কিছু প্রক্রিয়া পার করতে হবে।’ চুরি যাওয়া অর্থের যে অংশ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতেও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

কিম অংয়ের দেয়া অর্থের মালিক বাংলাদেশ- আদালত থেকে এমন আদেশ আসার পরই নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরত পাবে বাংলাদেশ। অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য এ মামলায় বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে পক্ষ হয়ে অর্থের মালিকানা দাবি করতে হবে। অন্যথায় এ অর্থ ফিলিপাইনের সরকারি সম্পত্তি হিসেবে ঘোষিত হবে। তবে দেশটির ফিন্যান্স কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের কথা ভাবছেন না। তারা বলছেন, বাংলাদেশকে অর্থ ফেরতে কেউ আপত্তি করবে না।

আশার ৩০ জুন : ফিলিপাইনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট অ্যাকুইনোর মেয়াদ শেষ হবে ৩০ জুন। দেশটির সিনেটের প্রেসিডেন্ট প্রো টেম্পোরে রাল্ফ রেক্টো বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘এটা (ওই দিনটি) আমাদের জাতীয় সময়সীমা হওয়া উচিত। প্রেসিডেন্ট অ্যাকুইনো ব্যক্তিগত জীবনে যাওয়ার আগে আমাদের অবশ্যই দেখতে হবে যে, চুরি হওয়া অর্থের মধ্যে যেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব তা সঠিক মালিকের কাছে ফেরত গেছে।’

হিসাব জব্দের নির্দেশ : এএমএলসির মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ব্যাংক হিসাবের লেনদেন ২০ দিনের জন্য স্থগিত/জব্দের নির্দেশ দেন। এ সময়ের মধ্যে এসব হিসাবে সব ধরনের লেনদেন বন্ধ থাকবে। কিম অং এরই মধ্যে যে অর্থ ফেরত দিয়েছেন তার একাংশও আদালতের সম্পদ জব্দের এ আদেশের আওতায় রয়েছে। এ ছাড়া পিএনবি অংয়ের ৪ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন পেসোর অ্যাকাউন্ট, একই ব্যাংকে ক্যাসিনো অপারেটর ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজর কোম্পানি লিমিটেডের ৫ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন পেসোর অ্যাকাউন্ট এবং আরসিবিসিতে ব্যবসায়ী উইলিয়াম গোর নামে থাকা ১৯ হাজার ৯৮৩ পেসোর অ্যাকাউন্ট জব্দের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
কিম অংয়ের পক্ষ থেকে ৩১ মার্চ ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার এবং ৪ এপ্রিল আট লাখ ৩০ হাজার ৫৯৫ ডলার এএমএলসির তত্ত্বাবধানে রাখার জন্য দেয়া হয়। পরে সোমবার তার কোম্পানি ইস্টার্ন হাওয়াইয়ের পক্ষ থেকে আরও ২০০ মিলিয়ন পেসো (প্রায় ৪৩ লাখ ডলার) দেয়া হয়েছে। প্রথম দু’দফায় তার ফেরত দেয়া অর্থ কর্তৃপক্ষকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে বলেছেন আদালত।
‘ডিং গ্রুপ’-এর ১০৭ মিলিয়ন পেসোর একটি অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে ম্যানিলার সোলায়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো কর্তৃপক্ষ। এর বাইরে ওই গ্রুপের জুয়াড়িদের কক্ষ থেকে আরও ১ দশমিক ৩৪৭ মিলিয়ন পেসো জব্দ করে তারা। এই অর্থ ফেরত দিতে আদালতের আদেশের অপেক্ষায় আছে তারা।
কোষাধ্যক্ষের পদত্যাগ : বৃহস্পতিবার ফিলিপাইন স্টক এক্সচেঞ্জকে জানানো হয়, কোষাধ্যক্ষ রাউল ভিক্টর তান বুধবার পদত্যাগ করেছেন। তবে এর কারণ জানানো হয়নি। ব্যাংকটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কার্লোস সিজার মার্কেডোকে ভারপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে। তান সাত বছর ধরে ব্যাংকটিতে কর্মরত ছিলেন।
এর আগে ব্লু-রিবন কমিটিতে হাজির হয়েছিলেন তান। তার বিরুদ্ধে চুরির ব্যাপারে ভুল বিচারের অভিযোগ এনে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু আরসিবিসির অভ্যন্তরীণ তদন্তে ব্যাংকের জুপিটার শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোর সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। এর আগে চাকরি হারান মায়া ও তার সহকারী অ্যাঞ্জোলা তোরেস।
নিষেধের দু’দিন পরও লেনদেন : বাংলাদেশ ব্যাংক আরসিবিসিকে অর্থ ছাড় না করার অনুরোধ জানিয়েছিল ৯ ফেব্র“য়ারি সকালে। অথচ ওইদিন দুপুরের পরও বড় অংকের অর্থ ছাড় করে জুপিটার শাখা। এবার আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন বরখাস্ত শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোর আইনজীবী ফার্দিনান্দ তোপাকিও। তিনি নথি, ইমেইল, ক্ষুদে বার্তা ও অন্যান্য প্রমাণাদি তুলে ধরে বলেছেন, ৫ ফেব্রুয়ারি দু’দফায় চুরির ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার আরসিবিসির সেটেলমেন্ট বিভাগে ঢোকে। ট্রেজারি বিভাগ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফিলরেমের কাছে ওই অর্থ যায়। অথচ তার দু’দিন আগেই (৯ ফেব্রুয়ারি) আরসিবিসি জানতে পারে ওই অর্থ ‘কালো’। আর ট্রেজারি শাখা প্রধান কার্যালয়েই, অন্য কোথাও নয়। তিনি প্রশ্ন করেন, ব্যাংকের কী ভূমিকা ছিল? এসব তথ্য ব্লু-রিবন কমিটির কাছেও তুলে ধরেন তিনি। শুরু থেকেই দেগুইতো দাবি করে আসছেন, তিনি দাবার একটি ঘুঁটি ছিলেন মাত্র।

পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকাশ : বৃহস্পতিবার গুলশানে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স (পিডব্লিউসি) বাংলাদেশ শাখার উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখনও রিপোর্টটি পড়িনি। তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত জানানো হবে।’

রিজার্ভ চুরিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা জড়িত কিনা এবং তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’ বুধবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন সচিবালয়ে তদন্ত কমিটির অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দেন। ৭৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা রয়েছে।

আইনগত দিক খতিয়ে দেখছে টাস্কফোর্স : টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান বৃহস্পতিবার সচিবালয় এক বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানান, ফিলিপাইন থেকে অর্থ ফেরত আনতে লিগ্যাল অ্যাডভাইস দরকার। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।

আশা করি, ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে। আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স তা পর্যালোচনা করছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস ও বাংলাদেশ ব্যাংককে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় পদক্ষেপ নিতে হবে- এ দুই সংস্থা সেটা শিগগিরই উপস্থাপন করবে। টাকা উদ্ধারের ব্যাপারে চলতি মাসের ১৩ তারিখে ৭ সদস্যের এ টাস্কফোর্স গঠন করে সরকার।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *