June 23, 2018

এইমাত্র পাওয়া সংবাদ

চে গুয়েভারার মৃত্যু

১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর বলিভীয় সৈন্যরা বন্দী অবস্থায় হত্যা করে এরনেস্তো চে গুয়েভারাকে। বলিভিয়ার এসব সৈন্য প্রশিক্ষিত, সুসজ্জিত ও নির্দেশিত হয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বেরেট ও সিআইএর প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। তার এই মৃত্যুদণ্ড বা হত্যাকাণ্ড কার্যকর ঘটনাটি রয়ে গেছে একটি ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে। তার মৃত্যুর প্রায় সাড়ে চার দশক পরেও বলিভিয়ায় তার গেরিলা হামলা, তার ধরা পড়া, তাকে হত্যা করা ও সমাহিত করাসহ নানা বিষয় এখনো বিশ্বব্যাপী ঔৎসুক্যের ও আলোচনা-সমালোচনার বিষয়।

১৯৯৭ সালে চে গুয়েভারার ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী পালনের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের ‘কিউবান ডকুমেন্টেশন প্রজেক্ট’ সিআইএ্, পররাষ্ট্র বিভাগ ও পেন্টাগনের বাছাই করা কিছু দলিলপত্র প্রকাশ করে। এসব দলিলপত্র চে গুয়েভারা ও তার মৃত্যুসংশ্লিষ্ট। ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের এসব ডিক্লাসিফাইড ডকুমেন্ট, তাকে নিয়ে লেখা দু’টি নতুন বই জর্জ কন্সডানেডার ‘কম্প্যানিরো : দ্য লাইফ অ্যান্ড ডেথ অব চে গুয়েভারা’ এবং হেনরি জর্জ বাটারফিল্ড রায়ানের ‘দ্য ফল অব চে গুয়েভারা’য় তার মৃত্যু সম্পর্কে আংশিক কিছু তথ্য জানা যায়। বলিভিয়ায় চে গুয়েভারার গেরিলা কর্মকাণ্ড সম্পর্কে হাজারো সিআইএ ডকুমেন্ট এখনো ক্লাসিফাইড রয়ে গেছে। এসব দলিল প্রকাশ করা হলে জানা যেত, কেন যুক্তরাষ্ট্র তার গেরিলা কর্মকাণ্ড এতটা আগ্রহের সাথে দীর্ঘ দিন অনুসরণ করে আসছিল। আর তার মৃত্যুর ব্যাপারে বলিভিয়ার ভূমিকাই বা কেমন ছিল।

 

পেছনের কথা
ক্রিস্টোফার কলম্বাস তার প্রথম অভিযানের সময় ১৪৯২ সালে কিউবাকে স্পেনের বলে দাবি করেন। ১৮৯৮ সালের এক যুদ্ধে আমেরিকা স্পেনীয়দের কিউবা থেকে বহিষ্কার করে। তখন দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী স্বার্থের প্রসার ঘটে। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৩৩ সালে কিউবার রাজনীতিতে আসেন ফুলজেনসিও বাতিস্তা ওয়াই ঝালদিভার। তখন সে সময়ের মিলিটারি সার্জেন্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন। এর ফলে সেখানে কায়েম হয় এক বিপ্লবী সরকার।
১৯৩৪ সালের জানুয়ারিতে বাতিস্তা নতুন এ সরকারকে উৎখাত করেন। স্বৈরশাসক হিসেবে ক্ষমতায় থাকেন ১৯৪০ সাল পর্যন্ত। এরপর হন বৈধ নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। ১৯৪৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন। তখন তিনি একজন জেনারেল। সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন ১৯৫২ সালের মার্চ পর্যন্ত। তখন তিনি এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে সরকার উৎখাত করেন। বাতিল করেন পরিকল্পিত নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্র বাতিস্তা সরকারকে স্বীকৃতি দেয় ২৭ মার্চ। বাতিস্তা ডিক্রি জারি করে দেশ চালাতে থাকেন। একটি দুর্নীতিবাজ সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে। অভিযোগ আছে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্যবসায়ে ও সংগঠিত অপরাধে জড়িত ছিলেন।

 

চে গুয়েভারার কথা
জন্ম ১৯২৮ সালের ১৪ জানুয়ারি। জন্মস্থান আর্জেন্টিনার রোজারিও। তার পরিবার ছিল উদার, মধ্যবিত্ত। মা-বাবার পাঁচ সন্তানের মধ্যে চে ছিলেন সবার বড়। ছোটবেলা থেকেই ভুগছিলেন হাঁপানি রোগে। সারা জীবন ভুগেছেন এ রোগে। ১৯৪৭ সালে তিনি ডাক্তারি ডিগ্রির জন্য পড়তে শুরু করেন বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছুটির সময় মোটরসাইকেলে করে ন্ধু অ্যালবার্তো গ্রানাদোকে নিয়ে বেড়াতে বের হতেন। বন্ধু গ্রানাদোর চালাতেন একটি ডিসপেনসারি। এটি ছিল আর্জেন্টিনার কর্ডোভার সন্নিকটে সানফ্র্যান্সিসকোর ডেল চানার একটি কুষ্ঠরোগী কলোনিতে। ১৯৫১-৫২ সালে ভ্রমণ সময়ে গুয়েভারা প্রথমে যান কর্ডোভার কুষ্ঠরোগীদের সাথে দেখা করতে। এরপর যান পশ্চিমে চিলিতে। এরপর উত্তরে পেরু, কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলা। এরপর যান যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি, সেখান থেকে ইমিগ্রেশন অথোরিটি তাকে ফেরত পাঠায়।
পেরুতে থাকার সময় কাজ করেন সান পাওলো লেপরোসারিয়ামে। তিনি অভিজ্ঞতা অর্জন করেন সেখানকার কুষ্ঠরোগীদের ব্যাপারে। তার ভ্রমণের সময় পর্যবেক্ষণ করেন গরিব ও বঞ্চিত মানুষদের অবস্থা। সেখানে তার রাজনৈতিক ধ্যানধারণার জন্ম হয়। তখন তার মনে এই বিশ্বাস জাগে, নির্ভেজাল সাম্য প্রতিষ্ঠা একমাত্র সমাজতন্ত্রের মাধ্যমেই সম্ভব। চে’র এই মোটরসাইকেলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা তিনি বর্ণনা করে গেছেন তার লেখা বই ‘মোটরসাইকেল ডায়েরিজ’-এ।
১৯৫২ সালে চে আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে রায়টে অংশ নেন। ১৯৫৩ সালে লাভ করেন তার মেডিক্যাল ডিগ্রি। এরপর চলে যান বলিভিয়া। তারও পরে যান গুয়েতেমালা। গুয়েতেমালা তখন শাসন করছিল জ্যাকব আরবেঞ্জ গুজম্যানের সংস্কারবাদী সরকার। গুয়েতেমালায় থাকার সময় চে গুয়েভারা তার প্রথম স্ত্রী হিলদার সাথে দেখা করেন। হিলদা ছিলেন একজন নির্বাসিতা পেরুবিয়ান মার্ক্সবাদী। এরপর এক সময় তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালের জুনে গুয়েতেমালার সরকার উৎখাত হয় সিআইএ সমর্থিত এক অভ্যুত্থানে। সিআইএ সেখানে একটি তালিকা তৈরি করে দেয় কিছু ব্যক্তির। বলে দেয়া হয় অভ্যুত্থানের পর এদেরকে অপসারণ, কারাবন্দী কিংবা দেশছাড়া করতে হবে। এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চে গুয়েভারা সহায়তা করেন। এরপর পালিয়ে যান মেক্সিকো সিটিতে। সেখানে কাজ করেন জেনারেল হাসপাতালে। সেই সাথে শিক্ষকতা করেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টিতে। গুজম্যান সরকারের পতনে সিআইএর ভূমিকার ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা তার মধ্যে এই বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়ে ওঠে সমাজতন্ত্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
মেক্সিকোতে থাকার সময় তিনি ১৯৫৫ সালে দেখা করেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সাথে। ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাইয়ে বাতিস্তা সরকারকে উৎখাতের ব্যর্থ অভ্যুত্থান-প্রয়াসের কারণে ক্যাস্ত্রোকে জেলে যেতে হয়। সেখান থেকে মুক্ত হয়ে ক্যাস্ত্রো স্বেচ্ছানির্বাসনে যান।
গুয়েভারা পরবর্তী সময়ে ক্যাস্ত্রোর সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ সম্পর্কে লিখেন : ‘আমাদের প্রথম অভিমত ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ঘিরে। মধ্যরাতের খানিকটা পর আমি হয়ে উঠলাম ফিউচার এক্সপেডিশনারিদের একজন।’
১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই চে গুয়েভারা তার মেক্সিকো ঘাঁটি থেকে শুরু করেন বিপ্লবী আন্দোলন। গুয়েভারা একটি গ্রুপে যোগ দেন মেডিক হিসেবে। সেখানে প্রশিক্ষণ নেন গেরিলা যুদ্ধের কৌশল বিষয়ে। ৮২ জনের একটি গ্রুপ দ্বীপের পুব দিকের ওরিয়েন্টি প্রভিন্সের উপকূলে অবতরণ করে ১৯৫৬ সালের ২ ডিসেম্বর। সেখান থেকে বাতিস্তা সরকারের ওপর হামলা চালান। এ হামলায় বেশির ভাগ বিপ্লবী নিহত ও বন্দী হয়। ক্যাস্ত্রো ও তার ভাই রাউল ও গুয়েভারাসহ বেঁচে যাওয়া ১২ জন ফিরে যান দক্ষিণের সিয়েরা মায়েসট্রা পাহাড় এলাকায়। সেখান থেকে এরা বাতিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে বেশ কয়েকটি সফল গেরিলা হামলা চালান। এর মাধ্যমে এরা ব্যাপক জনসমর্থন পান। তাদের বাহিনীর জনবল তখন তিন হাজারে উন্নীত হয়। একসময় প্রশ্ন ওঠে একজন মেডিক থাকবেন, না বন্দুক হাতে নেবেন? প্রশ্ন সম্পর্কে তিনি লিখেন, ‘মেডিসিন নিয়ে থাকব, না বিপ্লবী সৈনিক হব এ প্রশ্ন নিয়ে দ্বন্দ্বের মুখোমখি হলাম। আমার পিঠে বাঁধা ঝোলা ভর্তি ওষুধ ও একটি গুলির কেস। দু’টি একসাথে বহন করতে কষ্ট হচ্ছিল। আমি গুলির কেসটি সাথে নিলাম পেছনে ফেলে এলাম ওষুধ ভর্তি ঝোলা।’
গুয়েভারা হলেন ক্যাস্ত্রোর চিফ লেফটেন্যান্ট। তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন পুরোপুরি আলাদা ধরনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ও বেদরদি কৌশলী হিসেবে। বিশ্বাসঘাতক ও বিপ্লবে অটল না থাকাদের হত্যা করতে দ্বিধা করতেন না। পাশাপাশি সৈনিকদের কল্যাণ সম্পর্কেও ছিলেন উদ্বিগ্ন।
বিপ্লবীদের সাথে একজন কৃষকের বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তদন্ত সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘আমি এ অভিযোগ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত এক তদন্ত চালাই। আর অ্যারিস্টিডিও নামে কৃষককে হত্যা করি। …..সন্দেহজনক বিশ্বাসঘাতকতাও সহ্য করা ছিল অসম্ভব।’
ইউতিমিও গয়েররা নামে একজন কৃষক ও আর্মি গাইডকে তিনি মৃত্যুদণ্ড দেন। সে সম্পর্কে গুয়েভারা লিখে গেছেন, ‘আমি তার মগজের ডান পাশে দশমিক ৩২ ক্যালিবারের গুলি ছুড়ি। গুলিটি চলে যায় তার ডান কপাল ছেদ করে। কয়েক মুহূর্ত কাতরানির পর সে মারা যায়।’
একজন শক্তিধর বিপ্লবীর মতো গুয়েভারা ঘৃণায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি শেষজীবনে তার ‘মেসেজ টু দ্য ট্রাইকন্টিনেন্টাল’ বইয়ে লিখে গেছেন : ‘হেট্রিড (ইজ) অ্যান এলিমেন্ট অব স্ট্রাগল’। তিনি আরো লিখেছেন : “শত্রুর প্রতি অবিরাম ঘৃণা আমাদের সক্রিয়ভাবে অনুপ্রাণিত করে স্বাভাবিক মানবিক সীমাবদ্ধতা উতরে যেতে, যে সূত্রে মানুষ হয়ে উঠতে পারে একজন ইফেকটিভ, ভায়োলেন্ট, সিলেকটিভ আন্ড কোল্ড কিলিং মেশিন। আমাদের সৈনিকদের এমনটিই হতে হবে। ঘৃণা ছাড়া একজন মানুষ শত্রু পরাভূত করতে পারে না। আমাদেরকে আমাদের যুদ্ধকে নিয়ে যেতে হবে শত্রুর প্রতিটি কোণে : শত্রুর বাড়িতে তার বিনোদন কেন্দ্রে। চালাতে হবে টোটাল ওয়ার, সর্বাত্মক যুদ্ধ।”
১৯৫৭ সালে তাকে করা হয় বিপ্লবী বাহিনীর সবচেয়ে বড় পাঁচটি গেরিলা কলামের একটির কমান্ডার।
১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাতিস্তা সরকারকে দেয় ১০ লাখ ডলারের সামরিক সাহায্য। কিউবায় আমিরিকা হয়ে ওঠে প্রতিনিধিত্বশীল অর্থনৈতিক শক্তি। আর তখন কিউবাকে ধরে নেয়া হয়। একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্র হিসেবে। তার পরেও বিপ্লব থামিয়ে রাখা যায়নি। ১৯৫৮ সালের নভেম্বরে গেরিলাদের অগ্রসর করে ওরিয়েন্টি প্রভিন্স থেকে আরো সামনে মধ্যভাগের লাস ভিল্লাস প্রভিন্সে। ২৮ ডিসেম্বর গুয়েভারার কলাম দখল করে মধ্য কিউবার কৌশলগত প্রাদেশিক রাজধানী সান্টা ক্লারা। এরপর হাভানার পথ খুলে যায় তাদের জন্য।
১৯৫৯ সালের দিকে গেরিলা তৎপরতা আরো জোরদার হয়। বছরের প্রথম দিনে বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালান। ক্যাস্ত্রোর তিন হাজার লোকের বাহিনীর কাছে পরাজিত হয় বাতিস্তার ৩০ হাজার শক্তিধর প্রফেশনাল আর্মি। গুয়েভারা হাভানায় প্রবেশ করেন ২ জানুযারি। গঠিত হয় একটি নতুন অন্তর্বর্তী সরকার। ৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। এ দিনেই ক্যাস্ত্রো প্রবেশ করেন রাজধানী শহরে। ১৬ ফেব্রুয়ারি ক্যাস্ত্রো আসীন হন কিউবার প্রধানমন্ত্রী পদে। গুয়েভারাকে ‘কিউবান বর্ন’ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। তিনি বিয়ে করেন দ্বিতীয়বার। স্ত্রী অ্যালিদা। এরপর সফর করেন আফ্রিকা, এশিয়া ও যুগোস্লাভিয়া। আন্দোলনের সময় গুয়েভারা ও অ্যালিদা লড়াই করেন এক সাথে। তাদের ছিল চার সন্তান।
নয়া বিপ্লবী সরকার দ্রুত বাতিস্তা সরকারে সমর্থক বাতিস্তিয়ানদের গ্রেফতার ও বিচার সম্পন্ন করে। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, এরা বাতিস্তার স্বৈরশাসনামলে সরকারবিরোধীদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করত। লা কাবানা দুর্গের কমান্ডার হিসেবে গুয়েভারা এই বিচারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তখন সাবেক সরকারের পাঁচ শতাধিক বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। এমন খবরও প্রকাশ হয়, গুয়েভারা ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহী ছিলেন বাতিস্তার ‘ব্যুরো ফর রিপ্রেশন অব কমিউনিস্ট অ্যাকটিভিটিস’-এর সাবেক সদস্যদের বিচারের ব্যাপারে। ন্যাশনাল আর্মির পুনর্গঠনের সাথেও তিনি জড়িত ছিলেন। ১৯৫৯ সালের ৭ অক্টোবর গুয়েভারাকে নিয়োগ দেয়া হয় ন্যাশনাল অ্যাগ্রেরিয়ান রিফর্ম ইনস্টিটিউটের শিল্পায়ন কর্মসূচির ডিরেক্টর হিসেবে।

এই ইনস্টিটিউট তখন কাজ করত ভূমি সংস্কার সংস্থা হিসেবে। তা ছাড়া আমেরিকান মালিকানাধীন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও কৃষিখামারগুলোকে দখলচ্যুত করাও এ ইনস্টিটিউটের দায়িত্ব ছিল। গুয়েভারা এ দায়িত্বে ছিলেন ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত। এরপর তাকে করা হয় ন্যাশনাল ব্যাংক অব কিউবার প্রেসিডেন্ট। গুয়েভারা ছিলেন দ্রুত শিল্পায়ন ও অর্থনীতি কেন্দ্রীভূত করার পক্ষে। তখন সরকারে যারা দ্রুত কৃষি খাতের উন্নয়নের পক্ষে ছিলেন, তাদের সাথে গুয়েভারার দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। তার আরো অভিমত ছিল, কিউবাকে বাম রাজনীতির দিকে মোড় নিতে হবে এবং মিত্রতা গড়ে তুলতে হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে। তিনি আহ্বান জানান ‘নিউ ম্যান’ তৈরির, যারা নিজেকে ভুলে আত্মোৎসর্গ করবে সমাজের উন্নয়নের জন্য।
ভূমি সংস্কারের আওতায় কিউবায় জাতীয়করণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষিস্বার্থের ওপর আঘাত হানা শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিউবার সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। এ দিকে ক্যাস্ত্রো হঠাৎ করে গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে অস্বীকৃতি জানান।
১৯৬০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্যাস্ত্রো সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে একটি বাণিজ্যচুক্তি সই করেন। কিউবা সোভিয়েত তেল কেনার বিনিময়ে ১০ কোটি ডলার বাকিতে সোভিয়েত ইউনিয়নে চিনি রফতানিতে সম্মত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মার্চের দিকে কিউবার চিনি কেনা ও তেল সরবরাহ বন্ধ রাখে। অপর দিকে প্রবাসী কিউবানদের দিয়ে সিআইএ গোপনে প্যারামিলিটারি ফোর্স গঠন করে কিউবা দ্বীপে অনুপ্রবেশ করে ক্যাস্ত্রো সরকারকে উৎখাত করার জন্য। এই বছরের মে মাসে কিউবা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়। এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন আরো সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং কমিউনিস্ট দেশগুলোর সরকারের সাথে আরো চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সাথে বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়। ১৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর আংশিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয় খাবার ও ওষুধকে। এ সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে ওঠে কিউবার প্রধান সমর্থক ও বাণিজ্যিক অংশীদার। আগস্টে ‘টাইম’ ম্যাগাজিন গুয়েভারার ওপর একটি প্রচ্ছদকাহিনী প্রকাশ করে। এতে তাকে অভিহিত করা হয় ‘ক্যাস্ত্রোর ব্রেইন’ অভিধায়। এত বলা হয়, গুয়েভারা হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি ক্যাস্ত্রোকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে পুরোপুরি বাম বলয়ে নিয়ে যান। আর জোট গড়ে তোলেন রাশিয়ার সাথে। এ বছরেই গুয়েভারা লেখা শেষ করেন তার বই ‘গুয়েরা ডি গেরিলাস’ (গেরিলা ওয়ারফেয়ার)। এই বই ল্যাটিন আমেরিকা ও অন্যান্য স্থানে বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর ম্যানুয়েল বা নির্দেশিকা হিসেবে ব্যবহার হয়। এই ১৯৬০ সালেই ফ্যাশন ফটোগ্রাফার অ্যালবার্তো ডিয়াজ গুতিয়ারেজ গুয়েভারার বিখ্যাত সব ছবি তোলেন। ‘দ্য হিরোয়িক গেরিলা’ শিরোনামের এই ছবিগুলো বিশ্বব্যাপী বিপ্লবীরা আদর্শ ছবি বলে বিবেচনা করে।
১৯৬১ সালের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। সেই ক্যাস্ত্রো সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলার উদ্যোগ জোরালো করে তোলে। এপ্রিলের প্রথম দুই সপ্তাহে হাভানায় বেশ কয়েকবার সন্ত্রাসী বোমা হামলা চালানো হয়। অজানা বিমান থেকে কিউবান বিমানঘাঁটিতেও বোমা ফেলানো হয়। ১৭ এপ্রিল সিআইএ সমর্থিত ১৩০০ প্রবাসী কিউবান নিকারাগুয়ার এক ঘাঁটি থেকে কিউবায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায় দক্ষিণ উপকূলের বে অব পিগসে। তিন দিনের লড়াইয়ে এরা ধ্বংস হয়ে যায় ক্যাস্ত্রো বাহিনীর হাতে। এরপর ২০ হাজার কিউবানদের আটক করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়। ১৯৬০ সালে অক্টোবর থেকে ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে গুয়েভারা সফর করেন কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো। এসব দেশের মধ্যে ছিল চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চেকোস্লোভাকিয়া। তার এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল ঋণ জোগাড় করা ও বাণিজ্যিক চুক্তি করা। ১৯৬১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে হন কিউবা সরকারের শিল্পমন্ত্রী। এ সময়ও অব্যাহত রাখেন কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন। দাম নির্ধারণ করে দেন প্রধান প্রধান খাদ্যপণ্যের। কর কমিয়ে দেন। বেসরকারি সম্পদ জমার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। শিল্প উৎপাদন বাড়ানো হয়। আমদানি কমানো হয়। করের বোঝা স্থানান্তর করা হয় উচ্চ ও মাঝারি মাপের উপার্জনকারীদের ওপর। জুলাইয়ে এসে তিনি প্রকাশ্যে ক্যাস্ত্রোর সমালোচনা করেন সেনাবাহিনীতে অতিরিক্ত অর্থ খরচের জন্য। তার কথা ছিল এই অর্থ আরো ভালোভাবে শিল্প খাতে খরচ করা যেত। আগস্টে হন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সমন্বয় কমিটির সদস্য। ১৯৬২ সালের জুলাইয়ে হন এ বোর্ডের সেক্রেটারি। এ দিকে ২৬ জুলাই রেভলুশনারি মুভমেন্টকে একীভূত করা হয় কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির সাথে। ক্যাস্ত্রো ঘোষণা দেন কিউবা এখন থেকে একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ, যদিও সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন ক্যাস্ত্রো কমিউনিস্ট নন। ক্যাস্ত্রো তার ক্যারিশম্যাটিক পপুলারিটির ওপর ভর করে হন অনির্বাচিত একদলীয় সরকারের প্রধান।
১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি কিউবার ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরো সম্প্রসারিত করে। মার্চে এসে এ নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোর করা হয়। কিউবার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের আমদানি-রফতানি বন্ধ ঘোষণা করা হয়, এমনকি এই পণ্য যদি তৃতীয় কোনো দেশে উৎপাদিতও হয়ে থাকে।
অক্টোবরে এসে কিউবার মিসাইল ক্রাইসিস শুরু হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্র সরকার জানতে পারে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণ ঘাঁটি গড়ে তুলছে। ইউএস প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ও সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভের মধ্যে সম্পর্ক ১৩ দিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর শর্তাধীনে মিসাইল সরিয়ে নেয়া হয়। শর্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক থেকে তার ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহার করে নেবে এবং ক্যাস্ত্রো সরকারকে উৎখাত তৎপরতা থেকে বিরত থাকবে। এই সঙ্কট সময়ে গুয়েভারা ফার্স্ট স্ট্রাইকের পক্ষে মত দেন এবং কিউবা থেকে সোভিয়েত মিসাইল প্রত্যাহার করায় হতাশা প্রকাশ করেন।
১৯৬৩ সালে কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক-সামাজিক নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোর করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য অন্যান্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মতো এ দ্বীপরাষ্ট্র সফরও নিষিদ্ধ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে কিউবার যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। ডিসেম্বরে গুয়েভারা জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি বলেন, সমাজতন্ত্র কায়েমের একমাত্র নিশ্চিত উপায় হচ্ছে সশস্ত্র লড়াই। তার এই নীতির ফলে দেশে অর্থনীতির পতন ঘটতে ঘটতে তা প্রতিকূল অবস্থানে চলে যায়।
১৯৬৪ সালে এসেও কিউবায় গুয়েভারার অর্থনৈতিক নীতি অনুশীলন নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত থাকে। এ উদ্বেগ আরো বেড়ে যায় যখন তিনি আরো জোরালো তৎপর হন বিপ্লবকে কিউবার বাইরে ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার অন্যান্য দেশে নিয়ে যেতে। এ জন্য তিনি বিভিন্ন জায়গা সফর করে বিভিন্ন গেরিলা গোষ্ঠীর সাথে সাক্ষাৎ করতে থাকেন। এ সময় তিনি সফর করেন চীনের পিকিং, প্যারিস, আলজেরিয়া ও মস্কো। ডিসেম্বরে কানাডা, আলজেরিয়া ও মালি যাওয়ার আগে আবার জাতিসঙ্ঘে বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যে তিনি সমালোচনা করেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের।
১৯৬৫ সালে বছরের শুরুতেও তার সফর অব্যাহত রাখেন। যান কঙ্গো, এরপর গিনি, ঘানা, আলজিয়ার্স, প্যারিস, তানজানিয়া ও পিকিং। ফেব্রুয়ারিতে আলজিয়ার্সে ত্রিমহাদেশিক সম্মেলনে বক্তব্য বাখার সময় তিনি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সম্পর্কে তার স্বপ্নভঙ্গের আভাস দেন। তিনি বলেন, এসব দেশ তাদের নিজের স্বার্থে অনুন্নত দেশগুলোকে শোষণ করছে। মার্চে গুয়েভারা ফিরে আসেন কিউবায়। কিন্তু তার নীতি কিউবার রাজনৈতিক দৃশ্যপটে প্রায় অস্তিত্বহীন। ১২ মার্চ প্রকাশিত হয় তার ‘সোস্যালিজম অ্যান্ড ম্যান ইন কিউবা’ ট্রিটি। এতে তিনি বিস্তারিত তুলে ধরেন তার ‘নিউ ম্যান’ তত্ত্ব।
এপ্রিলে তিনি ক্যাস্ত্রোকে বলেন, তিনি সব সরকারি পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। পরিত্যাগ করছেন কিউবান জাতীয়তা। জুলাইয়ে একদল কিউবান স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে সফর করেন কঙ্গো। লক্ষ্য আজকের কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহীদের নিয়ে বিদ্রোহ চাঙ্গা করে তোলা। জনসমর্থনের অভাবে গুয়েভারা তা করতে ব্যর্থ হন।
৩ অক্টোবর ক্যাস্ত্রো জনসমক্ষে তাকে এপ্রিলে গুয়েভারার লেখা একটি বিদায়ী চিঠি পড়ে শোনান। চিঠিতে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় কিউবার বিপ্লবে সে দেশের ভূমিতে আমার দায়িত্বের অংশ আমি সম্পন্ন করেছি। আমি শুভবিদায় জানাই আপনাকে, কমরেডদেরকে, আপনার জনগণকে, যারা আমার নজেরও। … পৃথিবীর অন্যান্য জাতি আমার বিশুদ্ধ উদ্যোগ কামনা করছে।
একই সময়ে গুয়েভারা প্রণয়ন ও প্রচার করেন তার ‘মেসেজ টু দ্য ট্রাইকন্টিনেন্টাল’। এতে তিনি কার্যকর ও সক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বলেন : Our every action is a battle cry against imperialism. Abed a battle hymn for the people’s unity against the great enemy of the mankind: the United States of America’.
১৯৯৬৬ সালের মার্চে গুয়েভারা ফিরে আসেন কিউবায়। আবার দ্রুত সফরে চলে যান উরুগুয়ে, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও বলিভিয়ায় যেখানে তিনি যোগ দেন কমিউনিস্ট আন্দোলনে এবং হয়ে ওঠেন কমিউস্টি গেরিলা আন্দোলনের নেতা। চেষ্টা চালান সে দেশের সামরিক সরকার উৎখাতের।

 

গুয়েভারার মৃত্যু
১৯৬৭ সালে এই গেরিলা অভিযান কিছুটা সাফল্য পেলেও জনসমর্থন তেমন পায়নি। গুয়েভারার অভিযোগ, ‘জনগণ আমাদের কোনো সাহায্যই করেনি। এর পরিবর্তে বরং বিশ্বাসঘাতকতা করেছে’। বলিভিয়ায় তার গেরিলা দলে ছিল সর্বোচ্চ ৫০ জন পুরুষ ও একজন নারী। তাদের যাবতীয় কৌশল পরাভূত হয় যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষিত সিআইএ সমর্থিত ও পরামর্শিত ১৮০০ বলিভীয় সৈনিকের কাছে। ৮ অক্টোবর গুয়েভারা আহত হয়ে মধ্য-বলিভীয় পাহাড়ি অঞ্চলের ভ্যালেনগ্রান্দের কাছে আটক হন। আটককারীদের তিনি বললেন : ‘আমি চে গুয়েভারা। আমাকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে মেরে ফেলাই তোমাদের জন্য শ্রেয়।’
আটকের পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ভ্যালেনগ্রান্দে থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ৩০ কিলোমিটার দূরের লা হিগুয়েরা গ্রামে। সেখানে আটক আরো কয়জন বিদ্রোহীর সাথে তাকে একটি স্কুলঘরে প্রহরায় রাখা হয়। পরদিন দুপুরে সিআইএর ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার বুকে চারটি গুলি করে হত্যা করা হয়। জানা যায়, মৃত্যুর আগে তার শেষ কথা ছিল : I know you have come to kill me. Shoot coward, you are going to kill a man.
গুয়েভারা মারা গেলেন ৩৯ বছর বয়সে। মৃত্যুর পর তার হাত দু’টি কেটে নেয়া হয় তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিশ্চিত হওয়ার জন্য। ১১ অক্টোবর তার হাতবিহীন লাশ ও তার অন্য ছয় সহকর্মীর লাশ গোপনে ভ্যালেনগ্রান্দে বিমানবন্দরের কাছে কবর দেয়া হয়। ১৮ অক্টোবর ক্যাস্ত্রো হাভানা প্লাজায় ১০ লাখ লোকের এক সমাবেশে গুয়েভারার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রশংসাসূচক এক ভাষণ দেন। বক্তব্যে ক্যাস্ত্রো বলেন গুয়েভারা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিপ্লবীদের জন্য প্রেরণা ও আদর্শ রেখে গেছেন। যারা আজ গুয়েভারার মৃত্যুতে বিজয়োল্লাস করছে, তারা ভুল করছেন। তারাও ভুল করছেন, যারা মনে করেন তার মৃত্যুতে তার ধ্যানধারণা, তার কৌশল, তার গেরিলা-ধারণার মৃত্যু ঘটেছে।
একই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন রাস্ক ব্যারো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্সের পক্ষ থেকে একটি রিপোর্ট পান। এতে আভাস দেয়া হয় চে গুয়েভারার মৃত্যুদিন পালিত হতে যাচ্ছে তাকে একজন আদর্শ বিপ্লবী হিসেবে প্রশংসার মাধ্যমে।
১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে বলিভিয়ায় গুয়েভারার কবরের স্থান আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯৭ সালে তার ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনা হয় কিউবায়। ১৭ অক্টোবর তার দেহাবশেষ সান্তা ক্লারায় বিশেষভাবে নির্মিত একটি সমাধিতে আবার কবর দেয়া হয়। ১৯৫৮ সালে এ স্থানেই বাতিস্তার পরাজয় নিশ্চিত হয়েছিল। ২০০০ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী যে ১০০ জনমানুষের তালিকা প্রকাশ করে তাতে গুয়েভারার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে এই সাময়িকী উল্লেখ করে, কমিউনিজমের উত্তাপ কমে গেলেও গুয়েভারা রয়ে গেছেন শক্তিধর বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে। ২০০৮ সালে তার জন্মভূমি আর্জেন্টিনা গুয়েভারার ৩ দশমিক ৬ মিটার উঁচু ব্রোঞ্জের মূর্তি উন্মোচন করে তাকে সম্মান জানায় তার ৮০তম জন্মদিনে।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *