August 17, 2018

এইমাত্র পাওয়া সংবাদ

সোয়াত: এক টুকরো অপরূপ দুঃখগাথা!

পাকিস্তানের গোলযোগপূর্ন রাজ্য খাইবার পাখতুনখাওয়া। সন্ত্রাসীদের কারণে এই প্রদেশটি আজ গোলাবারুদের গন্ধে মলিন। অথচ এখানে রয়েছে বিখ্যাত সোয়াত উপত্যকাটি, যার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে মোহিত করে তুলবে। সম্প্রতি ওই এলাকা ঘুরে এসেছেন সৈয়দ মেহদি বুখারি। ওই পাহাড়ি উপত্যকার রূপকথা সদৃশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সেখানকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা নিয়ে ডন পত্রিকায় লিখেছেন ওই ভ্রমণকারী। তার লেখা ‘Swat — A beautiful tragedy’ নিবন্ধটি  বাংলামেইলের পাঠকদের জন্য রূপান্তর করা হল।


বাড়ির আঙ্গিনায় ফলবতী আপেল গাছ

নানা বিয়োগান্ত ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু যেন এই সোয়াত উপত্যকাটি। এহেন কোনো দুর্ঘটনা বা বিপর্যয় নেই যা এখানকার লোকজন ভোগ করেনি। এসব দুঃখগাথা লিখতে লিখতে এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের হাত অবশ হয়ে গেছে, ফুরিয়ে গেছে কলমের কালি। কিন্তু এসব অঘটন কিংবা সন্ত্রাসবাদ এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এতটুকু কালিমা লেপন করতে পারেনি। এখনো  সেই পাহাড়ি অঞ্চলটিতে রক্তিম লালিমা ছড়িয়ে দেয় সকালের সোনালি সূর্য। গোলাগুলির শব্দের মধ্যেও গাছের ছায়ায় একমনে খেলে চলে দুষ্টু ছেলে। এখনো ‍কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে স্বর্গীয় নদী সোয়াত।


ছবি তোলার জন্য পোজ দিয়েছে লাল টুকটুকে মেয়ে

অনেকগুলো আর্মি সেনাছাউনি পেরিয়ে শেষমেষ গিয়ে পৌঁছালাম সোয়াতে। তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। সন্ধ্যার সোনালি আলোয় চারপাশের স্বর্গীয় দৃশ্যাবলীতে মনটা জুড়িয়ে গেল। খয়েরি ঝোপের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে পূর্ণ চাঁদ। চারপাশে বইছে শরৎয়ের মৃদু মন্দ হওয়া। এ সময় এক শিক্ষিত পাখতুন যুবক আমার সামনে এসে দাঁড়াল। তার সঙ্গে গিয়ে পৌঁছালাম সোয়াতের মিনগোড়া বাজারে।


প্রকৃতি দেখায় মগ্ন দুই কিশোর

গোটা বাজার জুড়ে টের পেলাম প্রাণের ছোঁয়া, আগের সফরের সময় যা ছিল অনুপস্থিত। এখানে গড়ে ওঠেছে নিত্য নতুন কেতাদরুস্ত দোকান। তবে ভীড় বাট্টা আগের মতই আছে। একজন আমার হাতে একখানা ‘খাভা’র (ঐতিহ্যবাহী সবুজ চা) কাপ ধারয়ে দিলেন। বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে চায়ের সুঘ্রাণ। বাঁধভাঙা যৌবনের দূত যেন এই পাখতুন জাতি। হাসি ঠাট্টা আর কৌতুকে তারা জমজমাট করে তোলে জীবনকে। ওদের উজ্জ্বল চোখগুলো সবসময় তারার মত জ্বজ্বল করে। তাই বুঝি ওদের সান্নিধ্যে মুখ ভার করে থাকার কোনোই উপায় নেই। আমি বাজারের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে লোকজন আর জীবনকে দেখতে লাগলাম দু চোখ ভরে। রাত কাটালাম সোয়াত নদীর তীরে, ফিজা ঘাট এলাকায়।

পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে দেখি আকাশটা হীরকখণ্ডের মত ঝকঝক করছে। আমি সোয়াতের রাস্তা ধরে সোজা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পথে অসংখ্য পিচঢালা লিঙ্ক রোড চোখে পড়ল। এখানে সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সব্জি আর বিভিন্ন পণ্য বোঝাই ট্রাক। ক্ষেতে সেচের সুবিধার্থে অনেক খাল আর বাঁধ চোখে পড়ল। সৌদি অর্থায়নে এসব তৈরি করা হয়েছে। যাক, এবার তাহলে সেচের পানি নিয়ে এখানকার চাষীদের ঝগড়াঝাটি কমেছে। একসময় সোয়াতে পানি সঙ্কট ছিল। শুষ্ক মৌসুমে খাল আর ছোট নদীর জল শুকিয়ে যেত। তখন ক্ষেতের জন্য পানি পাওয়া যেত না। অন্যদিকে বর্ষার সময় বন্যায় ভেসে যেত ক্ষেতের ফসল। এখন এতগুলো খাল তৈরির ফেলে সেসব সমস্যার অনেকটাই সুরাহা হয়েছে।

এখানকার এক মাঠে দেখা হল খাজতা বাজ খানের সঙ্গে। তিনি তার ক্ষেতের মাঝখানে নিজের চাপেয়েতে (ছোট খাট) বসে সকালের হাওয়া খাচ্ছিলেন। আমি তার চারপেয়েতে গিয়ে বসলাম। তিনি কিছু পুরনো ক্যাসেট বাজাচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ গল্প করার পর তার ভৃত্য আমাদের জন্য এক জগ তাজা সরওয়ালা দুধ নিয়ে এল। খেতে খেতে জানতে চাইলাম,‘খান সাহেব, আপনার ক্যাসেটের ওই মেয়েটা কি গান গাইছে?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমার গ্রামের অর্ধেক সৌন্দর্য ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। বাকিটুকু খুন হবে খুব তাড়াতাড়ি।’ ওই অর্থ শুনে আমরা দুজনই জোরে হাসলাম। তার ক্ষেতে টমেটো তুলছিল মজুররা। আমাদের হাসির শব্দে তারা চমকে ওঠল।


সোয়াতের বিখ্যাত শ্বেত প্রাসাদ

সে রাতটা আমি খাওয়াজাখেলায় কাটালাম। এর আগে ৪/৫টা গ্রাম ঘুরে দেখেছি। রাতে প্রচণ্ড শীতে হু হু করে কাঁপছি। চারপাশে ভুতড়ে অন্ধকার। খানিক দূরে দূরে বৈদ্যুতিক বাতিগুলো কেবল সভ্যতার জানান দিচ্ছিল। আকাশে কোনো চাঁদ নাই। গোটা রাস্তা সুনসান, যেন কোথাও কোনো মানুষ নেই। অথচ খানিক আগেই এখানে কত লোক ছিল। শিশুরা খেলে বেড়াচ্ছিল রাস্তায়।

পরদিন বিকেলে আমি মেটা তহসিল এলাকায় একটা গ্রামে গেলাম। রাস্তায় কিছু শিশু খেলছিল। কিন্তু কোনো কারণে তারা ভয় পাচ্ছিল। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বললাম। শুনলাম তাদের দুঃখ আর অক্লান্ত পরিশ্রমের করুণ কাহিনী। জানতে পারলাম, এই অঞ্চলটিতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু করেছে জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউএনডিপি। গ্রামটি ছেড়ে আসার সময় শিশুরা আমার পিছু নিল। প্রধান সড়কে এসে দেখলাম লোকজন ভর্তি একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য আমার জন্য জিপ এসছিল। আমার জিপ আর ট্রাকটি পাশাপাশি চলতে শুরু করল। ট্রাকে একজন পশতু গলা ছেড়ে গান গাইছিল। তাই দেখে আমার ড্রাইভারও গান শুরু করল। তার গলা চমৎকার। সে গানটি আমায় অনুবাদ করে দিল।

‘আমি যখন এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাব তখন গ্রামটি নিঃসঙ্গ য়ে যাবে
কাঁদতে কাঁদতে আস, শেষবারের মত আমার সঙ্গে দেখা কর।’


বিখ্যাত সোয়াত নদী

সোয়াত নদীর স্ফটিক জল

আমরা যে রাস্তাটি দিয়ে আসছিলাম তার দুপাশে পিচ আর আপেল গাছের সারি। শরৎকাল বলে গাছের পাতাগুলো খয়েরি রং ধরেছে। তখন  জো খানের হৃদয় বিদারক কাহিনী মনে পড়ায় আমার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠেছিল। ভাবলাম, এই অঞ্চলটিতে এরকম কত দুঃখের কাহিনী ছড়িয়ে আছে। এদের দুঃখের কি শেষ আছে! আমরা খাওয়াজাভখলা এলাকায় একটা গ্রামের ভিতর দিয়ে আসছিলাম। গ্রামটির পিছনেবই বরফে ঢাকা হিন্দুকোষ পাহাড়ের চূড়াটি উঁকি দিচ্ছিল। সূর্ষের আলো পড়ে কি অদ্ভূত রংয়ের বিচ্ছুরণ যে ছড়াচ্ছে ওই চূড়াটা। সে দেখবার মতই দৃশ্যই বটে! যদিও সূর্য তখন পাটে বসেছে।

সোয়াত নদীর তীরে এসে থামলাম। অস্তয়মান সূর্যের আলোয় নদীর জলগুলো কমলার রং ধরেছে। সারাদিন পরিশ্রম করার পর বাড়ি ফিরছিল দুজন ক্ষেত মজুর। আমি এখন সম্পূর্ণ একা। নদীর ওপর দিয়ে কালাম পাহাড়ের চূড়ার দিকে উড়ে যাচ্ছিল বকের ঝাঁকটি। দেখলাম সবটুকু অন্ধকার ঠোটে নিয়ে পাখিগুলো উড়ে যাচ্ছে। আমিও ওঠতে শুরু করলাম চড়াই বেয়ে। খানিকটা ওঠার পর গোটা উপত্যকা নজরে এল। সে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। কি অদ্ভূত সৌন্দর্য ধারণ করে রয়েছে এই ক্ষুদ্র উপত্যকাটি, জঙ্গিরাও এই প্রকৃতিকে পরাস্ত করতে পারেনি। তাই বুঝি ঈশ্বর প্রদত্ত সবটুকু সৌন্দর্য নিয়ে এখনো সে দাঁড়িয়ে আছে, ঔদ্ধত্য ভঙ্গিতে।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *